কৃষির বেশ কয়েকটি প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) বদলে তোড়জোড় শুরু করেছে কৃষি মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দুটি সংস্থা। পিডি বদলের তালিকায় রয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) ১১টি প্রকল্প ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের দুটি প্রকল্প। একসঙ্গে এত প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন নিয়ে কৃষিমন্ত্রী প্রশ্ন
তোলার পর এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ডিএইতে পরস্পরবিরোধী পক্ষগুলোর মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, কৃষি মন্ত্রণালয় গত ২০ সেপ্টেম্বর ১৩টি প্রকল্পের বর্তমান পিডিদের বাদ দিয়ে নতুন পিডি নিয়োগের জন্য সভা আহ্বান করে। নতুন পিডি হিসেবে কাদের নিয়োগ করা হবে, ওই সভায় সেই সিদ্ধান্তও হয়। তবে সম্প্রতি বিষয়টি কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদের নজরে এলে তিনি আরও পর্যালোচনার জন্য পিডি বদলের কার্যক্রম থামিয়ে দেন।
প্রকল্পগুলোর পিডি বদলের তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘কৃষির উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পদ এখনো ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দখল করে রেখেছেন। তাঁরা নতুন সরকারের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে নানা ষড়যন্ত্র শুরু করেছেন। তাই অতি দ্রুত ফ্যাসিস্ট পিডিদের বদল করতে হবে।’
এ বিষয়ে জানতে কৃষি সচিব মো. সেলিম খানকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বদলের তালিকায় রয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ১১টি প্রকল্প। এর সাতটিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ করা প্রকল্প পরিচালক থাকলেও চারটি প্রকল্পে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পরে পিডি নিয়োগ করা হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের পরে নিয়োগ পাওয়া পিডিরা হলেন, ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের মোহাম্মদ আব্দুল কায়ুম মজুমদার, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের শেখ আব্দুল্লাহ ওয়াহেদ, পার্টনার প্রকল্পের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর আবুল কালাম আজাদ ও কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের রাশেদ হাসনাত।
পিডি বদলের তালিকায় থাকা ডিএইয়ের অন্য সাতটি প্রকল্পের পিডিরা আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে বহাল রয়েছেন। তাঁরা হলেন, টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের তালহা জুবাইর মাসরুর, ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের খন্দকার মুহাম্মদ রাশেদ ইফতেখার, মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের রাসেল আহমেদ, বিল্ডিং ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস ইন ভালনারেবল ল্যান্ডস্কেপস ইন বাংলাদেশ প্রকল্পের লোকমান হোসেন মজুমদার, কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার প্রকল্পের এ এন এম আনোয়ারুল হাসান, কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের শহিদুল ইসলাম এবং স্মলহোল্ডার অ্যাগ্রিকালচার কম্পিটিটিভনেস প্রকল্পের মুহাম্মদ এমদাদুল হক। বর্তমানে দায়িত্বে থাকা প্রকল্প পরিচালকদের কয়েকজনের দাবি, ডিএই ও মন্ত্রণালয়ের একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে পিডি বদল করতে চাইছে। এই প্রক্রিয়ায় একজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বিএনপির কৃষিবিদদের সংগঠন অ্যাগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (অ্যাব) ও কৃষক দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা। তাঁদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন চিহ্নিত পিডি থাকলেও তাঁদের বিষয়ে ডিএই প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে। এই তালিকায় সিলেট অঞ্চলের পিডি, চট্টগ্রাম অঞ্চলের পিডি ও কুমিল্লা অঞ্চলের একজন ডিপিডি রয়েছে বলে দাবি করেন তাঁরা।
ডিএইয়ের ১১টি প্রকল্পের মতোই বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) দুটি বড় প্রকল্পে একই দিন কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে পিডি বদলের প্রস্তাব করা হয়। প্রকল্প দুটির বর্তমান পিডিরা হলেন চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি নুরুল ইসলাম ও বিএডিসির বিদ্যমান বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থাদির আধুনিকীকরণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি ইব্রাহিম খলিল। সেচ প্রকল্পে নতুন পিডি হিসেবে নিয়োগের জন্য প্রস্তাবিত তিনটি নামের মধ্যে এক নম্বরে রয়েছে বিএডিসির রাঙামাটি সেচ সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাহেদের নাম। বীজ উৎপাদন প্রকল্পে পিডি নিয়োগের জন্য প্রস্তাবিত তিনটি নামের মধ্যে এক নম্বরে রয়েছে বিএডিসির বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ বিভাগের ব্যবস্থাপক আল মামুন মেহেদী হাসানের নাম।
পিডি বদলের তৎপরতার বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ বলেন, কেন একসঙ্গে এতজন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। পিডি বদলি ও পদায়নে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে সেটিও তদন্ত করে দেখা হবে।