জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী এ ধরনের কোনো পরিষদের আইনি ভিত্তি নেই, ফলে রাষ্ট্রপতি এমন অধিবেশন ডাকতে পারেন না।
আজ রোববার বেলা ১১টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। শুরুতেই বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান অনির্ধারিত আলোচনার সুযোগ চাইলে স্পিকার তাঁকে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন। প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে শফিকুর রহমান ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’-এর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এই আদেশের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আজ এই সময়সীমা শেষ হচ্ছে, কিন্তু কোনো অধিবেশন ডাকা হয়নি। আমরা বিরোধী দলের ৭৭ জন সদস্য জুলাই আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছি। আমরা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য এবং সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ চাই। সংসদ সদস্যরা দুটি আলাদা ভোটের মাধ্যমে দুটো ক্যাপাসিটিতে নির্বাচিত হয়েছেন, যা আইনত সিদ্ধ।’
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ আদেশটিকে ‘অসাংবিধানিক’ এবং ‘জবরদস্তিমূলক’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, সংবিধানের ৯৩ (১) (ক) ধারা অনুযায়ী সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন হতে পারে এমন কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আনা যায় না। তিনি এ আদেশের প্রকৃতি নিয়ে কৌতুক করে বলেন, ‘এই আদেশটি না অধ্যাদেশ, না আদেশ। এটা মাঝামাঝি কী জিনিস? একে আমি “নিউটার জেন্ডার” বা ক্লীবলিঙ্গ বলতে পারি। আমি এখানে কোনো অসাংবিধানিক বা আন-পার্লামেন্টারি শব্দ ব্যবহার করতে চাই না।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও যুক্তি দেন, সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংবিধানে ‘সংস্কার পরিষদ’ বলে কিছু নেই। ফলে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে কোনো পরামর্শ দিতে পারেন না। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি তাঁর ক্ষমতাবলে সংসদের অধিবেশন ডেকেছেন, সেখানে ভাষণ দিয়েছেন। বিরোধী দলের বন্ধুরা সেই ভাষণ শুনতে না চেয়ে ওয়াকআউট করেছেন, আবার এখন তাঁরাই সেই ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনার দাবি করছেন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এই সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোটের একটি অংশ নিয়ে ইতিমধ্যে উচ্চ আদালতে রিট হয়েছে। আদালত রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন কেন এটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না। তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগ মতামত দিতে পারে, কিন্তু বিচার বিভাগের মতামত এই সার্বভৌম সংসদের ওপর কখনো বাধ্যতামূলক নয়। তবে সংসদ এমন কোনো আইন করতে পারে না যা আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে অবৈধ হয়ে যায়।’
গণভোটের ব্যালটে ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের মাঝখানে চারটি প্রশ্ন জুড়ে দেওয়ার সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি একটি আরোপিত আদেশ ছিল, যা পড়তে তাঁর নিজেরই সাড়ে তিন ঘণ্টা লেগেছে। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র ইমোশন দিয়ে চলে না, চলে আইন ও সংবিধান দিয়ে। গণভোটের রায়কে শ্রদ্ধা জানিয়ে আগে সংবিধানে সংশোধন আনতে হবে। যদি সংবিধান তা ধারণ করে, তবেই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার প্রশ্ন আসবে।’
পরিশেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আসুন আমরা কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে বসি। জুলাই জাতীয় সনদ পালনে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সমঝোতার ভিত্তিতে বিল আনতে চাই যাতে ইনশা আল্লাহ আমরা সংবিধান মেনেই রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।’
সংসদে এই বিতর্ক সংবিধান সংস্কারের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।