স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও নতুন করে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির জন্য আবেদন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান। তিনি জানিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির জন্য আর কোনো নতুন আবেদন নেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে যাঁরা আবেদন করেছেন, তাঁদের আবেদন চুলচেরা যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
আজ বুধবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের তালিকা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের প্রকৃত তালিকা প্রণয়নের কৌশল ও করণীয় নির্ধারণে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
আহমেদ আজম খান বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হয়ে যাচ্ছে। এখন কেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দরখাস্ত নেওয়া হবে? স্বাভাবিকভাবে স্বাধীনতার পর এক-দুই বছরের মধ্যেই এটা শেষ হওয়া দরকার ছিল।’
তিনি বলেন, ‘আমি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও দেখেছি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দরখাস্ত নেওয়া হচ্ছে। এ কারণে ৭ অক্টোবরের পর আর দরখাস্ত না নেওয়ার জন্য আমি প্রজ্ঞাপন দিয়েছি। তবে যাঁরা ইতিমধ্যে আবেদন করেছেন, তাঁদের চুলচেরা যাচাই-বাছাই করা হবে।’
মন্ত্রী বলেন, যাচাই-বাছাইয়ের পর সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কেউ বাদ পড়ে থাকলে তাঁকে তালিকাভুক্ত করা হবে। তবে যত আবেদনই করা হোক না কেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।
তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় আসবেন তাঁরাই, যাঁরা সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধা। চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে করা হবে।’
মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় বিপুলসংখ্যক ‘অমুক্তিযোদ্ধা’ অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, এ নিয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। বিভিন্ন জায়গায় ৮৫ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার কথা বলা হলেও তিনি তাঁদের ‘অমুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আহমেদ আজম খান বলেন, ‘আগের তালিকা থেকেই এসব বিষয় উঠে এসেছে। রাস্তাঘাটে, সংসদে এবং গণমাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অমুক্তিযোদ্ধা কেন মুক্তিযোদ্ধা থাকবে, এটাও স্বাধীনতার ইতিহাসের একটা দায়। সেখান থেকেও আমরা বেরিয়ে আসতে চাই।’
তিনি জানান, বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় দুই লাখ তিন হাজার। তবে যাচাই-বাছাই শেষে এ সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
নতুন করে তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) মাধ্যমে কমিটি গঠন, তদন্ত ও সাক্ষাৎকারসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘জামুকায় কমিটি হবে, টিম হবে, তদন্ত হবে, এরপর ইন্টারভিউ হবে। সবকিছু তদন্তের পর আরও যাচাই-বাছাই করে তালিকা করতে হবে।’
অতীতে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে আহমেদ আজম খান বলেন, ‘অতীতে অনেকে বলেছেন, আগের রেজিমে অনেকটা মুক্তিযোদ্ধা বানানোর ফ্যাক্টরি ছিল। সেটা আর হবে না, ইনশা আল্লাহ।’
সভায় মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদদের তালিকা এবং সম্ভ্রমহানির শিকার নারীদের বিষয়েও আলোচনা হয়। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই স্বাধীনতার ইতিহাস সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হোক। আগামী দিনে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে স্বাধীনতার ইতিহাস মানুষ সঠিকভাবে জানুক।’
সম্প্রতি ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আহমেদ আজম খান বলেন, ‘সেটি কেবলই সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল। ভারতীয় হাইকমিশনার মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে এসেছিলেন শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে। সৌজন্য সাক্ষাতের বাইরে আর কিছুই আলোচনা হয়নি।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘স্বাধীনতা কিন্তু বারবার আসে না। একবার এসেছে, আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে যুগ যুগ থাকব। এখানে যেন ইতিহাসের কোনো দায় না থাকে, কোনো মিথ্যা না থাকে, কোনো কলঙ্ক না থাকে—সেই চেষ্টাটা আমরা চালিয়ে যাব।’