নদী, খাল ও উপকূল দখল-দূষণ রোধে কঠোর আইনগত কাঠামো গড়ে তুলতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের হাতে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় নদী দখল ও দূষণকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় খসড়া আইনটি চূড়ান্ত করে জনমত গ্রহণের জন্য তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। মতামত শেষে এটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদে পাঠানো হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নদী দখল, প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্পদূষণ মোকাবিলায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
খসড়ায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে একটি স্বাধীন ও কার্যকর সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে সুপারিশভিত্তিক ভূমিকার বাইরে গিয়ে কমিশনকে সরাসরি তদন্ত, অভিযান পরিচালনা এবং আদালতে মামলা করার ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর একটি হলো দেশের সব নদীকে ‘আইনগত অভিভাবক’ ও ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। এতে নদীর ক্ষতিকে আইনি ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং নদীর পক্ষে মামলা পরিচালনা সহজ হবে।
খসড়া অনুযায়ী, নদী, খাল ও উপকূলসংলগ্ন এলাকায় কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বা অবকাঠামো নির্মাণের আগে কমিশনের ‘অনাপত্তি’ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আগে কোনো প্রকল্প অনুমোদন করা হলেও সংশোধন বা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এই অনুমতি লাগবে। এতে নিয়ম এড়িয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে নদীতীরে স্থাপনা নির্মাণ অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আইনের প্রস্তাবে নদী দখল, ভরাট, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, বর্জ্য ফেলা, বালু উত্তোলন এবং নদীর প্রবাহ পরিবর্তনকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অপরাধে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১৫ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই অপরাধ পুনরায় করলে শাস্তি দ্বিগুণ করার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচার এবং প্রয়োজনে বিশেষ ‘নদী আদালত’ গঠনের কথাও খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনটি কার্যকর হলে কমিশন দেওয়ানি আদালতের মতো কিছু ক্ষমতাও পাবে। তারা নোটিশ জারি, নথি তলব, জিজ্ঞাসাবাদ, তদন্ত পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় সরাসরি প্রবেশ করতে পারবে। নদীদূষণে পরিবেশের ক্ষতি হলে কমিশন ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করতে পারবে। ক্ষতিপূরণ না দিলে আদালতে মামলা করা হবে।
খসড়ায় কমিশনকে কোনো নদী বা খালকে ‘সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এসব এলাকায় বিশেষ নজরদারি, দখল উচ্ছেদ, খনন এবং পরিবেশ সংরক্ষণমূলক কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
নতুন আইনে কমিশনকে দেশের সব নদী, খাল ও উপকূলের ‘আইনগত অভিভাবক’ হিসেবে বিবেচনা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে এগুলোকে ‘পাবলিক ট্রাস্ট প্রোপার্টি’ হিসেবে ঘোষণা করে জনগণের সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণের আইনি ভিত্তি তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এই আইনের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মকসুমুল হাকিম চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সংশোধিত খসড়ায় কমিশনকে কার্যকর করতে বিচারিক ক্ষমতা ও শাস্তির বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বর্তমানে কমিশন শুধু সুপারিশ করতে পারে, যা বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো কার্যকর হলে কমিশনের কাজের সক্ষমতা বাড়বে। তবে খসড়াটি এখনো প্রক্রিয়াধীন, চূড়ান্ত অনুমোদন সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। খসড়ায় মতামত নেওয়া শেষ হলে আইনের প্রস্তাবটি যাবে মন্ত্রিপরিষদে; তারপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য যাবে সংসদে।’
তবে আইনটির বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। অতীতে নানা অভিযান চালানো হলেও প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইনের কঠোরতা নয়, এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং নিয়মিত মনিটরিং জরুরি।
পরিবেশ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, আইনটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের নদ-নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে এটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তবে প্রয়োগে দুর্বলতা থাকলে এটি আগের অনেক আইনের মতো কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘অতীতে নদী রক্ষা কমিশন অনেকটা ‘নখবিহীন বাঘের’ মতো ছিল। তারা সুপারিশ করতে পারলেও সরাসরি কোনো ব্যবস্থা নিতে বা দূষণকারীদের আইনের আওতায় আনতে পারত না। জেলা পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও তাদের জেলা প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হতো। নতুন খসড়া আইনে কমিশনকে শাস্তি প্রদানের ক্ষমতাসহ আরও কিছু কার্যকর ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব ইতিবাচক।’
তবে অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান বলেন, ‘এই ক্ষমতা তখনই ফলপ্রসূ হবে, যখন কমিশন তা বাস্তবে প্রয়োগে আন্তরিক হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিভিন্ন কমিশন তাদের নিজস্ব ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন নয় বা নানা চাপের কারণে তা প্রয়োগে অনীহা দেখায়—এমনটি যেন নদী রক্ষা কমিশনের ক্ষেত্রে না ঘটে। তাই নতুন আইন পাস হলে এর সুফল যেন সত্যিকার অর্থে নদী রক্ষায় কাজে লাগে, এটাই সবার প্রত্যাশা।’
নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নদ-নদীর অবৈধ দখল, দূষণ প্রতিরোধ এবং নাব্যতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একটি রিটের ২০০৯ সালে হাইকোর্ট বিভাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেন। ওই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়। আইনটি আরও কার্যকর করতে ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আন্তমন্ত্রণালয় সভার মাধ্যমে সংশোধনের উদ্যোগ নেয় এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে খসড়া সংশোধন করা হয়।