পুলিশ বাহিনীর বিশেষ ইউনিট স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) অতীতের র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) উত্তরসূরি হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে বলে মনে করছেন কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। এ কারণে নাম নতুন হলেও বাহিনীটি আন্তর্জাতিক নজরদারি বা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিমুক্ত থাকবে না বলেই মনে করেন তাঁরা।
নতুন নামের এসআরবি বিলুপ্ত র্যাবের নেতৃত্ব, জনবল, সম্পদ, অবকাঠামো কিংবা কার্যক্রম সবই পাচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এই ধারাবাহিকতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এসআরবিকে র্যাবের উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
সাবেক কূটনীতিক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমেরিকান ডেস্কের মহাপরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘নতুন নামে আসা বিশেষ বাহিনী আরও বেশি নজরদারির মধ্যে পড়তে পারে। আগের বাহিনীর ইতিহাসের কারণে তাদের ছোটখাটো মানবাধিকার লঙ্ঘনও বড় করে দেখা হতে পারে।’
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমানের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ সাধারণত শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম দেখে সিদ্ধান্ত নেয় না। নতুন বাহিনীর নেতৃত্ব, সদস্য ও কর্মকর্তা, আইনগত ভিত্তি, কমান্ড কাঠামো, কার্যক্রম ও বিধিবিধান এবং আগের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ধারাবাহিকতা রয়েছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সামগ্রিক উন্নতিও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাব এবং বাহিনীটির বর্তমান ও সাবেক ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাহিনী বা কর্মকর্তা কারও ক্ষেত্রেই তা প্রত্যাহার হয়নি।
সংসদে এসআরবি গঠন-সংক্রান্ত বিলের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, র্যাবের সঙ্গে এসআরবির কোনো সংস্পর্শ নেই। র্যাবের জনবল, সম্পদ, দায়দেনা—সবই নতুন সংস্থায় হস্তান্তর করার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয় না করার লক্ষ্যেই তা করা হয়েছে।
এর আগে গত ১৮ মে র্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে র্যাবকে ব্যবহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। তবে নাম বদল বা পুনর্গঠন করা হলে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
বাহিনীর নাম পরিবর্তন হলেও লোগো ও ইউনিফর্ম পর্যন্ত এখনো কার্যত একই। প্রতীকে আগের সব ঠিক রেখে র্যাব এর তিনটি ইংরেজি অক্ষরের বদলে বসেছে এসআরবি। যদিও ১৫ সেপ্টেম্বর বাহিনীর মহাপরিচালক (ডিজি) ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবীব পলাশ আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর ঘোষণা দিয়ে বলেন, এসআরবি-র লোগো, পতাকা এবং পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি চলমান রয়েছে।
সার্বিকভাবে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে, বিলুপ্ত র্যাবেরই জনবল, কমান্ড কাঠামো ও কার্যক্রমের বড় অংশ অপরিবর্তিত রেখে মূলত নাম পরিবর্তন করা হলে তা বিদেশি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়তে সহায়তা করবে কি?
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তর এবং বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের বিভিন্ন সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনীসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অন্তত ১৭ থেকে ১৮টি ইউনিট ও কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি দপ্তরের। নাম পরিবর্তন করে কেউ নিষেধাজ্ঞার হাত থেকে রক্ষা পায়নি। ইরানের ল এনফোর্সমেন্ট ফোর্সেস (এলইএফ) ২০১১ সালে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসে। ২০২১ সালে বাহিনীটির নাম ও সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন করে ল এনফোর্সমেন্ট কমান্ড (ফারাজা) করা হলেও আগের নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাহার হয়নি। কারণ, নতুন বাহিনীকে আগেরটির উত্তরসূরি হিসেবেই দেখা হয়েছে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও এমন নজির আছে।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) খোদা বকশ চৌধুরী এ বিষয়ে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র দেখবে এসআরবি আসলে পুরোনোটার মতো কাজ করে কি না। নিজেদের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করে কি না, এসব তাদের দেখার বিষয়। সেগুলো বিবেচনা করেই যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেবে।’
বাহিনীর নাম পরিবর্তন করলেই ভাবমূর্তির পরিবর্তন বা অতীতের দায় মুছে যাবে এমন মনে করেন না মানবাধিকার এবং সুশাসন নিয়ে কাজ করা জ্যেষ্ঠ অধিকার কর্মীরা।
গুম-সংক্রান্ত কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘র্যাব বিলুপ্ত করার ধরনে প্রতীয়মান হয়, এটি নতুন মোড়কে পুরোনো বাহিনী। মৌলিক কোনো পরিবর্তন নেই। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এটিকে র্যাবের উত্তরসূরি হিসেবেই বিবেচনা করবে। তাই নতুন এই বাহিনীও বিভিন্নভাবে প্রশ্নের মুখে থাকবে।’
ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘একটি বাহিনীর নাম পরিবর্তন করলেই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হয় না।’
র্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ ও তাঁর পক্ষে প্রমাণ থাকার কথা উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নতুন বাহিনীর কাঠামো, জনবল, ক্ষমতা, বলপ্রয়োগের বিধান এবং জবাবদিহির ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। তা না হলে র্যাবের বদলে ‘এসআরবি’ নামে একই ধরনের ক্ষমতা ও সংস্কৃতির একটি বাহিনী গড়ে উঠতে পারে। টিআইবির দাবি, কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়া র্যাবের সদস্যদের ঢালাওভাবে এসআরবিতে স্থানান্তর করা হলে অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নতুন বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘নাম পরিবর্তন করে তাৎক্ষণিক কোনো সুবিধা পাওয়া যাবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র নতুনটিকেও পর্যবেক্ষণে রাখবে। তারা দেখবে আসলে মানবাধিকারের বিষয়টি নতুন সংস্থা কীভাবে গুরুত্ব দেয়। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের সঙ্গে তাদের কূটনীতিক সম্পর্ক কেমন যায়, তার ওপরও এটি নির্ভর করবে। তবে নতুন এসআরবি যেহেতু অতীতের র্যাবের সবকিছুই পাচ্ছে, তাই র্যাবের দুর্নামে তারও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’