তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সময়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, প্রযুক্তিকে শিক্ষকের বিকল্প হিসেবে দেখতে চায় না সরকার। বরং প্রযুক্তিকে শিক্ষকের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এ লক্ষ্যেই ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আজ সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ের ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোকে আরও আধুনিক করা জরুরি। একজন শিক্ষক ট্যাবের মাধ্যমে ডিজিটাল লেসন প্ল্যান, প্রশ্নব্যাংক, শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষণসামগ্রী ব্যবহার করতে পারবেন বলেও জানান তিনি।
দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সম্প্রসারণের পাশাপাশি ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধাও বাড়ানো হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
শিক্ষকতার মর্যাদা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, শিক্ষকতা কোনোভাবেই ‘উপায়হীন বিকল্প’ বা সাধারণ চাকরির মতো পেশা হতে পারে না। শিক্ষা-দীক্ষায় সবচেয়ে মেধাবীরা যাতে কর্মজীবনে শিক্ষকতাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেন, সে লক্ষ্যে সরকার শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি জড়িত। সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বাড়ে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের এ সময়ে প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির বাইরে এসে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। তাই ‘শিখন’ ও ‘শিক্ষণ’ পদ্ধতির কৌশল পরিবর্তন এবং সিলেবাস আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।
বাস্তবতার নিরিখে সরকার নতুন সিলেবাস প্রণয়ন করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বছরের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা নতুন সিলেবাস অনুযায়ী বই হাতে পাবে।
শিক্ষার্থীদের শুধু মুখস্থনির্ভর না করে ‘কেন’ ও ‘কীভাবে’—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে উৎসাহিত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। কৌতূহল তৈরি হলে একজন শিক্ষার্থী নিজেই নিজের শিক্ষক হয়ে উঠতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘আনন্দময় শিক্ষা’র গুরুত্ব তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশেও এবার প্রথমবারের মতো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ শিরোনামে নতুন একটি বই তুলে দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শ্রেণিতেও এ ধরনের বই দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে কোনো শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না। শিক্ষাজীবনের যেকোনো পর্যায়ে কেউ ঝরে পড়লেও যেন বেকার না থাকে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
শিক্ষা খাতকে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ বাজেট আরও বাড়ানো হবে।
শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর মূল ভিত্তি হচ্ছে সমান সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার। শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুযোগের পার্থক্য কমিয়ে দক্ষ শিক্ষক ও আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
কর্মমুখী শিক্ষা প্রয়োজন হলেও কর্মসংস্থানই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য নয় উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনও শিক্ষার অন্যতম মূল উদ্দেশ্য। সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও অন্যের প্রতি সম্মানকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত শিক্ষকদের ‘গুণী শিক্ষক’ সম্মাননা দেওয়া হয়। এ বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য—‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশা সুরক্ষার ৬০ বছর, মর্যাদা উন্নয়ন এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গঠন’।
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া।