বাসমালিকের কাছ থেকে প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা জমা দেওয়ার চাপ থাকায় চালকেরা সড়কে অশুভ প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েন বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। তাঁর মতে, চালকদের নির্দিষ্ট বেতন দেওয়া গেলে এই প্রতিযোগিতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
আজ সোমবার তেজগাঁও সড়ক ভবনের অডিটরিয়ামে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের আওতায় বাসমালিকদের সঙ্গে আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
হাবিবুর রশিদ বলেন, পরিবহন খাতে অনেক আলোচনা ও সভা হচ্ছে, কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। দিন যত যাচ্ছে, হতাশা তত বাড়ছে। এই হতাশাকে প্রত্যাশায় রূপ দিতে হলে সামনে থাকা মালিক, শ্রমিক ও প্রশাসনের নেতাদেরই দায়িত্ব নিতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোম্পানি গঠনের উদ্দেশ্য যদি শুধু লভ্যাংশ বণ্টন হয়, তাহলে তা জাতির প্রত্যাশা পূরণ করবে না। একটি রুটে বাস পরিচালনার জন্য কোম্পানিতে বাস অন্তর্ভুক্ত করতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও ৫০০ টাকা, কোথাও এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এ ব্যবস্থারও সংস্কার প্রয়োজন।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, অনেক সময় কোম্পানির মালিক বাসটি পরিচালনার দায়িত্ব চালকের ওপর দিয়ে দেন এবং চালককে প্রতিদিন নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে বলা হয়। কোথাও তিন হাজার, কোথাও পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা দিতে হয়। চালক সেই টাকা কীভাবে দেবেন, তা সড়কে বের হলে দেখা যায়।
হাবিবুর রশিদ বলেন, একই কোম্পানির বাসের চালকেরাও একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ছেন। চালকদের জিজ্ঞেস করলে তাঁরা বলেন, প্রতিদিন নির্দিষ্ট টাকা জমা দিতে হয়। অন্য বাসকে বাধা না দিয়ে বা প্রতিযোগিতা না করে সেই টাকা দেওয়া সম্ভব হয় না। এই অশুভ প্রতিযোগিতার কারণে সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
চালকদের কমিশন বা দৈনিক জমার পরিবর্তে নির্দিষ্ট বেতন দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যদি প্রত্যেক চালকের বেতন নির্দিষ্ট করে দেওয়া যায়, কমিশনের ব্যবস্থা বাদ দেওয়া যায়, তাহলে অনেক শৃঙ্খলা চলে আসতে পারে।
পরিবহন কোম্পানিগুলোর আয় ব্যবস্থাপনায়ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন হাবিবুর রশিদ। তিনি বলেন, অনেক পরিবহনে প্রতিটি বাস থেকে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা করে তোলা হয়। কিন্তু এই টাকা কোথায় ব্যয় করা হয়, তার স্বচ্ছ হিসাব থাকা দরকার।
এই অর্থ শ্রমিকদের কল্যাণে, আহত শ্রমিকদের সহায়তা কিংবা নষ্ট বাস মেরামতে ব্যয় করা হয় কি না, সে প্রশ্নও তোলেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব অর্থ প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাস থেকে টাকা তোলা ও সেই টাকা বণ্টনের ব্যবস্থার কারণেও সড়কে অশুভ প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির একটি বড় অংশের সম্পর্ক রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ থেকে বেরিয়ে আসতে কোম্পানিগুলোকে সঠিকভাবে পরিচালনার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, পরিবহন কোম্পানি শুধু লভ্যাংশ বণ্টনের জন্য নয়, পরিবহন খাতকে আরও গতিশীল ও সুশৃঙ্খল করার জন্য ব্যবহার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি সেগুলোর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।
হাবিবুর রশিদ বলেন, পরিবহন খাতে পরিবর্তন আনতে পুলিশ প্রশাসন, বিআরটিএ, মালিক ও শ্রমিকদের আন্তরিক হতে হবে। পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। শুধু নিজেদের লাভের কথা না ভেবে দেশের পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে সীমাবদ্ধ সক্ষমতার মধ্যেও অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। মালিক ও শ্রমিক নেতারা আন্তরিক হলে ঢাকাসহ সারা দেশে একটি সুশৃঙ্খল পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।