সরকারের চাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ থেকে নির্বাচন কমিশন সরে এসেছে—এমন অভিযোগ নাকচ করেছেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তাঁর ভাষ্য, সংবিধান, আইন ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় কাজ করে ইসি। নভেম্বর-ডিসেম্বরে পরীক্ষা থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন এড়াতে ওই সময়ের বাইরে নির্বাচন আয়োজনের চিন্তা করছে কমিশন।
বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন আনোয়ারুল ইসলাম সরকার।
চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করে ইসি। এ নিয়ে সরকারের একাধিক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা প্রতিক্রিয়া জানান। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আলোচনা ছাড়াই ইসি তারিখ ঘোষণা করেছে।
১৭ সেপ্টেম্বরের আন্তমন্ত্রণালয় সভায় চলতি বছরে ইউপি নির্বাচন সম্ভব নয় বলে ইসিকে জানায় সরকার। এরপর সম্ভাব্য তারিখ থেকে সরে আসে ইসি। কমিশনের পক্ষ থেকে নভেম্বর-ডিসেম্বরে পরীক্ষার বিষয়টি যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
সরকারের চাপে ইসি পিছিয়ে গেছে কি না জানতে চাইলে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘মোটেই না। বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে আমাদের কোমলমতি লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর লেখাপড়ায় যাতে বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়, সেই দিক বিবেচনায় রেখেই আমরা সম্ভাব্য তারিখ কিছুটা সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিলাম।’
এ ভাবনা আগে কেন আসেনি জানতে চাইলে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা সময়ের প্রেক্ষিতে আমরা চিন্তা করি, পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে। নির্বাচন তো হতেই হবে, ইনশাআল্লাহ।’
বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় ইসি পিছিয়ে গেছে কি না জানতে চাইলে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘পিছিয়ে যাইনি। পিছিয়ে যাব কেন? আমরা তো সব সময়ই বলছি, এই তারিখগুলো সম্ভাব্য। নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বলছি? তফসিল ঘোষণার আগে নির্দিষ্ট তারিখ বলা ঠিক হবে না।’
ইসি আনোয়ারুল আরও জানান, নভেম্বর-ডিসেম্বরে পাবলিক পরীক্ষা ব্যাহত না হওয়া এবং শিক্ষার্থীদের নির্বিঘ্নে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে ওই সময় বাদ দিয়ে পরবর্তী সময়ে নির্বাচন আয়োজনের কথা ভাবছে ইসি।
জানুয়ারি থেকে নির্বাচন শুরু হতে পারে কি না জানতে চাইলে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘সাধারণত বার্ষিক পরীক্ষা নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যেই হয়। সেই বিবেচনা করেই আমরা সূচি নির্ধারণ করব। এই পরীক্ষাগুলো ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হয়ে গেলে জানুয়ারির দিকে আমরা, ইনশাআল্লাহ, করতে পারব।’
নভেম্বরের ১২ তারিখে প্রথম ধাপসহ দুই ধাপে নির্বাচনের তারিখ দেওয়ার আগে পরীক্ষা ও অন্য বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, অনেক বিষয় বিবেচনা করেই ইসি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। ইসির কাজ হলো আইনের ভেতরে থেকে সংবিধান অনুযায়ী কাজ করা।
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘আমরা সম্ভাব্য একটি তারিখ ঘোষণা করেছিলাম। পরে দেখা গেল, ১২ তারিখের পরই প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে।’
বন্যায় উচ্চমাধ্যমিকের কিছু পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ায় সেগুলোর সমন্বয় এবং পাঠ্যসূচি শেষ করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি। কিছু এলাকায় বন্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পরীক্ষার আগে নির্বাচনী প্রচার শুরু হলে শিক্ষার্থীরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে বলে মন্তব্য করেন নির্বাচন কমিশনার। লাখ লাখ প্রার্থীর সন্তানও পরীক্ষার্থী উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বাস্তবতা বিবেচনায় ডিসেম্বরের বিষয়টিও আরও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করেছে ইসি।
আগামী বছরের শুরুতে রোজা, ঈদ ও বিভিন্ন পরীক্ষা থাকলে তফসিল কীভাবে করা হবে এ প্রশ্নে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, রমজান, ঈদ, পূজা, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সব দিক বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন আয়োজনের উপযোগী সময় নির্ধারণের চিন্তা করছে কমিশন।
সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ প্রসঙ্গে সিইসি আরও জানান, চিঠি, টেলিফোনে কথাবার্তা বা সামনাসামনি বিভিন্নভাবে যোগাযোগ হতে পারে। তবে নথিপত্র পরীক্ষা করে নির্বাচনের তারিখ বা সুবিধাজনক সময় নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে জানিয়েছে, এমন কোনো পত্র যোগাযোগের নজির পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পরই ইসি ভোটের উদ্যোগ নেবে কি না এমন প্রশ্নে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, এ ধরনের চিঠি চালাচালির কোনো রেওয়াজ তিনি দেখেননি।
মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে বলে সরকারের একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী যে মন্তব্য করেছেন, সে বিষয়ে কথা বলতে চাননি তিনি। তবে তথ্য আদান-প্রদান হবে বলে জানান নির্বাচন কমিশনার।
ইউনিয়নগুলো নির্বাচন উপযোগী কি না, মামলা-মোকদ্দমা, সীমানা নির্ধারণ ও মেয়াদ পূর্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় তথ্য চাইলে সংশ্লিষ্টরা তা দেবে বলে জানান তিনি। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই কর্মপরিকল্পনা তৈরি হবে।
জানুয়ারি থেকে শুরু করে ৬ জুনের মধ্যে ইউপি নির্বাচন শেষ করা সম্ভব কি না জানতে চাইলে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘সবকিছুই সম্ভাব্য। ৬ জুনের মধ্যে নির্দিষ্টভাবে শেষ করার বিষয় নয়, একটি সময়সীমা ধরে আমরা চিন্তাভাবনা করছি।’
মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তি হলে নির্বাচনের উপযোগী ইউনিয়নের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও জানান তিনি। সীমানাসংক্রান্ত বিরোধ, নতুন ইউনিয়ন সৃষ্টি ও অন্যান্য আইনি জটিলতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অতীতে জাতীয় নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের অনেক নির্বাচন নভেম্বর-ডিসেম্বরে হয়েছে, তখনও পরীক্ষা ছিল—এমন প্রশ্নে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, অতীতে এমন হয়েছে কি না, তা তাঁর জানা নেই। নভেম্বর-ডিসেম্বরে পরীক্ষা থাকায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা উদ্বিগ্ন থাকেন বলেও জানান তিনি।
পাবলিক পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে আয়োজন ও শৃঙ্খলা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নিয়োজিত থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সময়ে নির্বাচন আয়োজন আসলেই কঠিন।
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য মাহবুবা হাকিমের নির্বাচনী হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ভুল তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা জানি না। আনুষ্ঠানিকভাবে জানলে পরে আইনগতভাবে যা হয়, তাই করব।’
পৃথক প্রশ্নে তিনি বলেন, বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ইসির নজরে আসেনি। স্পিকারের মাধ্যমে বিষয়টি এলে বা কেউ অভিযোগ করলে আইনগত পদ্ধতিতে তার নিষ্পত্তি হবে। অভিযোগ করারও একটি নির্ধারিত পদ্ধতি রয়েছে বলে জানান তিনি।