উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম রাজস্ব আয় ও দুর্বল আর্থিক খাত—এই তিন দিক থেকে চাপে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখা ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার থেকে বেরিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সরকারের নীতিতে অগ্রাধিকারে রাখার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এ জন্য সংস্থাটির পক্ষ থেকে সংকোচনমূলক কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়ানো ও আর্থিক খাতের সংস্কারের ওপর জোর দিতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মধ্যে বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে এসব বিষয় তুলে ধরে সংস্থাটি।
এদিন আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৈঠক শেষে তিনি জানান, নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। তবে এই ঋণে শর্ত থাকবে, আর তা পূরণও করতে হবে। নিতে হলে শর্ত পূরণ করতে হবে, আর কিছু বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। যেখানে কিছু বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আরও আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করা হবে।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জৈন-চন্দ্র বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতি—এই তিন ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এভাবে গত সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। তবে মূল্যস্ফীতি কমাতে গিয়ে প্রবৃদ্ধির ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, সেই সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই নীতি ও সংস্কারের সমন্বয় জরুরি বলে মনে করছে আইএমএফ। বাংলাদেশে সংস্থাটির নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনায় এসব খাতের সংস্কার আনার ওপর বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের দুর্বলতা তুলে ধরেছে সংস্থাটি। বর্তমানে দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭ শতাংশ, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন অনুপাতগুলোর একটি। উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থ জোগানো এবং আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে এই অনুপাত বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন ও কর আহরণ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে আইএমএফ।
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে সংস্থাটির। আইএমএফের মতে, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি একটি বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কৌশল প্রয়োজন। ব্যাংক খাতের বিদ্যমান সমস্যা সমাধান ও ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণ নিয়েও নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত, ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশেরও সম্মতি আছে। ইতিমধ্যে অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে, বাকি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চলবে। সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশেরও নিজস্ব পর্যবেক্ষণ রয়েছে। দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে এসব বিষয়ে সমাধান করা হবে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বাজেট-পরবর্তী অগ্রগতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের অগ্রগতি নিয়ে আইএমএফ সন্তোষ প্রকাশ করেছে। শুধু আইএমএফ নয়, বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গেও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করবে সরকার।
আগের ঋণ কর্মসূচির আওতায় আর কিস্তি না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর গত মে মাসে বাংলাদেশ নতুন কর্মসূচির জন্য আইএমএফের সহায়তা চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জুলাইয়ে সংস্থাটির প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। ওই সফরে আলোচিত সংস্কারগুলো চলতি বছরের আর্টিকেল ফোর পরামর্শে দেওয়া সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে জানান সোনালি জৈন-চন্দ্র। এর পর থেকে দুই পক্ষের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে আইএমএফ আগ্রহী।