দীর্ঘ ছয় দশকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পারমাণবিক শক্তির অবারিত দ্বারে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। আজ মঙ্গলবার পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে (রিঅ্যাক্টর ভেসেল) পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোড করার কাজ শুরু হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের মধ্য দিয়ে বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশগুলোর তালিকায় (নিউক্লিয়ার ক্লাব) আনুষ্ঠানিকভাবে নাম লেখাবে বাংলাদেশ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন জানিয়েছে, চুল্লিপাত্রে ইউরেনিয়াম জ্বালানি স্থাপন বা ‘ফুয়েল লোডিং’ বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত পর্যায়ের সূচনা। এই জ্বালানি দহন বা ‘ফিশন’ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপে পানি বাষ্পীভূত হবে এবং সেই বাষ্পের প্রচণ্ড শক্তিতে টারবাইন ঘুরে উৎপাদিত হবে কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ।
গ্রিডে বিদ্যুৎ আসবে কখন?
বাণিজ্যিকভাবে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরুর আগে কেন্দ্রটিকে কঠোর নিরাপত্তা ও কারিগরি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, আগামী আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যেই জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কেন্দ্রটি থেকে শতভাগ বা পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে আরও প্রায় ১০ মাস সময় প্রয়োজন হবে।
ধীরে ধীরে চুল্লিপাত্রের শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা ৩, ৫, ১০, ২০, ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এতে আরও ৪০ দিন সময় লাগতে পারে। ৩০ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযোগ করা সম্ভব হবে। এখান থেকে শুরু হবে রূপপুরের বিদ্যুৎ সরবরাহ। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে জাতীয় গ্রিডে শতভাগ বিদ্যুৎ পেতে প্রায় ১০ মাস সময়ের প্রয়োজন হবে।
কেন্দ্রটি পূর্ণ উৎপাদনে গেলে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ থেকে ১২ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম হবে।
প্রকল্পের শুরু ও আর্থিক ব্যয়
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের ইতিহাসের একক বৃহত্তম মেগা প্রকল্প। ১৯৬১ সালে প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হলেও জমি অধিগ্রহণের পর তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের অবহেলায় তা থমকে যায়। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান প্রকল্পটি পুনরায় সচল করেন। ১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার ও রুশ ফেডারেশন সরকারের মধ্যে একটি আন্তরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে এটি পূর্ণতা পায়।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। যদিও ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে প্রকল্পের মূল ব্যয় অপরিবর্তিত আছে, কিন্তু বিশ্ববাজারে ডলারের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশি টাকায় খরচ বেড়েছে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কাজ কিছুটা পিছিয়ে গেলেও ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে পুরো প্রকল্প সমাপ্ত হওয়ার নতুন লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
কারিগরি খুঁটিনাটি
পারমাণবিক জ্বালানি মূলত ইউরেনিয়াম অক্সাইড দিয়ে তৈরি ছোট ছোট প্যালেট বা দানার সমন্বয়ে গঠিত। প্রতিটি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি বা জ্বালানি বান্ডিলে ৩১২টি রড থাকে। রূপপুরের প্রথম ইউনিটে ব্যবহারের জন্য ১৬৩টি বান্ডিল চুল্লির কেন্দ্রে বসানো হবে।
একবার জ্বালানি লোড করলে তা দিয়ে প্রায় ১৮ মাস বা দেড় বছর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে।
জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় এটি অনেক সাশ্রয়ী। সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে বছরে যেখানে এক কোটি টন কয়লা লাগত, সেখানে পারমাণবিক জ্বালানিতে খরচ হবে অনেক কম। এ ছাড়া এই কেন্দ্রের আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ৬০ বছর, যা রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে ৯০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
পরিবেশগত প্রভাব ও কর্মসংস্থান
পরিবেশবিদদের মতে, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশের জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে। কয়লা বা গ্যাসচালিত কেন্দ্রের তুলনায় এটি বছরে প্রায় দুই কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমাবে। এ ছাড়া প্রকল্পের নির্মাণকালে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ কাজ করেছেন এবং বর্তমানে আড়াই হাজার স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, যার একটি বড় অংশ উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দেশীয় জনবল।
উদ্বোধন অনুষ্ঠান
আজকের এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে নিরাপত্তা মানদণ্ডের ওপর বক্তব্য দেবেন। ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বর্জ্য বিশেষ নিরাপত্তার মাধ্যমে রাশিয়ায় ফেরত নেওয়া হবে, যা আইএইএর কড়া নজরদারিতে থাকবে।
একনজরে রূপপুর প্রকল্প:
অবস্থান: ঈশ্বরদী, পাবনা।
মোট উৎপাদন ক্ষমতা: ২,৪০০ মেগাওয়াট (১,২০০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট)।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান: অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট (রাশিয়া)।
প্রযুক্তির ধরন: ভিভিইআর-১২০০ (সর্বাধুনিক ৩+ জেনারেশন রিঅ্যাক্টর)।
বৈশ্বিক অবস্থান: ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ।