যমুনা নদীর ওপর বর্তমানে চার লেনের একটি বড় সেতু চালু রয়েছে, যা দেশের উত্তর-দক্ষিণ সংযোগের প্রধান করিডর। এ ছাড়া রেল যোগাযোগের জন্য নতুন করে নির্মিত হয়েছে আলাদা রেলসেতু। এর পরও ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপের পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যতের বিবেচনায় এবার নদীটিতে আরেকটি সড়কসেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। এখন সেতুটি নির্মাণের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালাতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান খোঁজা হচ্ছে।
তবে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা নতুন সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক চরিত্র যাতে বজায় থাকে এবং নৌপথ ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেই বিষয়টি মাথায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
সেতু বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে বিদ্যমান যমুনা সেতুর ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার উজান অথবা ভাটিতে নতুন সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিষয়টি মাথায় রেখেই সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। সমীক্ষার পরই চূড়ান্তভাবে নতুন সেতুর স্থান নির্ধারণ করা হবে। সূত্র বলেছে, বর্তমান যমুনা সেতুর খুব কাছাকাছি বা আশপাশে নতুন সেতু নির্মাণ করা হবে না। নতুন সেতুর মাধ্যমে উত্তর-দক্ষিণ স্থল যোগাযোগে নতুন একটি রুট বা বিকল্প করিডর তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা এটাও বলছেন, নতুন সেতুটি ঠিক কোথায় নির্মাণ করা যায়, এর সম্ভাব্য ব্যয় কত, নকশার ধরন কেমন এবং আদৌ যমুনায় নতুন সেতু নির্মাণ করা যৌক্তিক বা সম্ভব কি না; সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হওয়ার পরই তা চূড়ান্তভাবে জানা যাবে।
নতুন সেতুর প্রয়োজনীয়তার পক্ষে যুক্তি দিয়ে সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া যমুনা সেতু একটি চার লেনের সেতু। বর্তমানে যানবাহনের চাপ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। আগামী ১০ বছরে এই সেতুর ধারণক্ষমতা পূর্ণ হয়ে আসবে। এ ছাড়া সেতুর আগে দুপাশের মহাসড়কগুলো ছয় লেন পর্যন্ত উন্নীত করা হয়েছে। যমুনা সেতু তুলনামূলকভাবে সরু। এই সেতুর একপাশের পথে পাশাপাশি দুটি বড় যানবাহন চলতে সমস্যা হয়।
সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা আরও জানান, যমুনার মতো বড় নদীতে সেতু নির্মাণের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগে। তাই আগাম পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আব্দুর রউফ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগ ও নিরাপত্তার স্বার্থেই যমুনা নদীর ওপর নতুন একটি সড়কসেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নতুন সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।’
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালানোর জন্য সেতু বিভাগ দেশি-বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আগ্রহপত্র (এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট–ইওআই) আহ্বান করেছে। সেতু বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে ২০টির বেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওআই জমা দিয়েছে। কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি প্রাথমিকভাবে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত করেছে। এই ছয় প্রতিষ্ঠান এখন বিশদ প্রস্তাব জমা দেবে। এর ভিত্তিতে একটি প্রতিষ্ঠানকে সমীক্ষা চালানোর কাজ দেওয়া হবে।
সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, সংক্ষিপ্ত তালিকার ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হবে। আগামী নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে তারা এই প্রকল্প নিয়ে আরও বিস্তারিত পরিকল্পনা করতে পারবে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
সেতু নির্মাণের অর্থই হচ্ছে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহের ওপর কমবেশি হস্তক্ষেপ। সাধারণভাবে কারিগরি প্রক্রিয়ায় এর প্রভাব ন্যূনতম রাখার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। যমুনায় প্রথম সেতুটি নির্মাণের পর যোগাযোগে বিপ্লব হওয়ার পাশাপাশি অনেক চর জেগে ওঠাসহ নদীর ওপর নেতিবাচক প্রভাবও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করে। গত বছরই আবার প্রথম যমুনা সেতুর ৩০০ মিটার উত্তরে নির্মাণ করা হয়েছে রেলসেতু। এ প্রেক্ষাপটেই আরেকটি সড়কসেতুর উদ্যোগ নেওয়ায় সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশিষ্ট নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সেতু নির্মাণের আগের সমীক্ষা অবশ্যই নির্ভরযোগ্যভাবে চালাতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গোপনীয়তা রাখা যাবে না। পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সেতু নির্মাণে চর সৃষ্টি হবে কি না, নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়বে কি না, এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে যাচাই করতে হবে সমীক্ষায়। এ জন্য স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকৃত বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করতে হবে।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, ‘যদি একই করিডরে তিনটি সেতু নির্মাণ করা হয়, তাহলে তা দীর্ঘ মেয়াদে নাব্যতা ও নদী ব্যবস্থাপনায় জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই নতুন সেতু নির্মাণের সময় অবশ্যই ভিন্ন স্থান ও ভিন্ন করিডর বিবেচনা করা প্রয়োজন, যাতে নদীর স্বাভাবিক চরিত্র বজায় থাকে এবং নৌপথ ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। এ বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে।’
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘উত্তরবঙ্গের গেটওয়েকে আরও বিস্তৃত করা জরুরি। তবে নতুন সেতুটি যমুনা সেতুর কাছাকাছি বা একই করিডরে না করে ভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা উচিত।’