প্রতিটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে খুনোখুনি হয় উল্লেখ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, ‘সেটা বন্ধে সবার সহযোগিতা নিয়ে আমরা কাজ করব। রক্তপাত বন্ধ করা আমাদের মূল লক্ষ্য। বর্তমান সরকারকে জনগণ ভোট দিয়ে বসিয়েছে। তাই তারা তো অবশ্যই দেশের মঙ্গল চাইবে। আমাদের বিশ্বাস সরকার অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ স্থানীয় সরকার চাইবে। তাতে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন চ্যালেঞ্জিং হবে। তা মোকাবিলার জন্য আমরা সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনসের (আনফ্রেল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পর্যবেক্ষণের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন সিইসি।
অনুষ্ঠানে সিইসি আরও বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংঘাতের ঘটনা বেশি হয়েছে। অনেক জায়গায় শুধু প্রাণহানি নয়, বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হয়েছে। এ জিনিস থামাতে হবে। তা থামানোটা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমরা কোনো রক্তপাত চাই না। রক্তপাতহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচন আমরা দিতে চাই। আমরা সবার সহযোগিতা চাই।’ এ বিষয়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সিইসি।
সিইসি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা কর্মসূচি চালু করবে ইসি। স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়ে সিইসি বলেন, ‘সবাইকে একত্র করার চেষ্টা করব। যাতে এ ধরনের সংঘাত এড়িয়ে সুন্দর স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিতে পারি, সে চেষ্টা করব।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সিইসি অতীতের সহিংসতার তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্য অনুসারে ২০১৬ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ২৩৬ জন নিহত হন। এ ছাড়া আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১১৬ জন নিহত হন।
সিইসি আরও বলেন, ‘আমাদের চেষ্টার কোনো ঘাটতি থাকবে না। আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাব। আমাদের চেষ্টার সঙ্গে সবার সহযোগিতা পেলে দেশের স্বার্থে, সবার স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে...গণতন্ত্র শুধু জাতীয় পর্যায়ে হলে হয় না, তৃণমূলের গণতন্ত্র আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইউপি সদস্যরা সরাসরি মানুষের সেবার সঙ্গে জড়িত। গণতান্ত্রিক সরকারের সেবাগুলো স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছায়। তাই স্থানীয় সরকার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
দলীয় সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইসি চাপ বোধ করবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘নির্বাচনের জন্য সরকার মূল অংশীজন। তাদের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব হয় না। কারণ, সরকারের সব এজেন্সিকে আমরা কাজে লাগাই। পুলিশ, সেনাবাহিনী, প্রশাসনসহ সব সরকারের লোক। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে যে সহযোগিতা চেয়েছি, তা তাঁরা দিয়েছিলেন। নির্বাচনের সফলতার জন্য তাঁদের অবদান অবশ্যই আছে। গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে সে উদাহরণ আমরা সৃষ্টি করতে পারব। কারণ, রাজনীতিবিদেরা দেশের কথা চিন্তা করেন, মঙ্গলের কথা চিন্তা করেন। তাই সবাই মিলে আমরা ভালো নির্বাচন দিতে পারব।’
পৃথক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘এই সরকারের অধীনে তো আমরা কোনো নির্বাচন করিনি। তাই এ নিয়ে আগাম কোনো মন্তব্য করা যায় না।’
সিইসি আরও বলেন, ‘আমাদের সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। দেশে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৬১ জেলা পরিষদ, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং প্রায় ৩৩০টি পৌরসভা রয়েছে। এসব পর্যায়ের নির্বাচন আয়োজন একটি বিশাল দায়িত্ব। এখানে সহযোগিতা আরও বেশি প্রয়োজন।’
ঋণখেলাপিদের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগের প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, ‘এ নিয়ে আমি কোনো বক্তব্য দিতে চাই না। কারণ, সর্বোচ্চ আদালতে দুটি মামলা বিচারাধীন আছে। তবে আমরা কারও প্রতি দয়া দেখাইনি।’
ভোটের অভিজ্ঞতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ইসির কর্মশালার বিষয়ে সিইসি বলেন, ‘কোথায় কোথায় আমাদের উন্নতি করতে হবে তা চিহ্নিত করছি। কারণ, নির্বাচন কমিশন দুটো জাতীয় নির্বাচন করতে পারে না। তারা একটা নির্বাচন করে বিদায় হয়ে যায়। নতুন কমিশন এসে নতুন করে শুরু করে। তাই তাদের জন্য নির্বাচনের অভিজ্ঞতা রেখে দিতে চাই। আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো কী ছিল, তাদের কোথায় উন্নতি করতে হবে। এগুলো প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকবে।’
ভোটার সচেতনতা কর্মসূচি ইসি গ্রহণ করবে উল্লেখ করে সিইসি বলেন, ‘আমরা অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলব। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের সমর্থন খুবই দরকার। তাদের সমর্থন ছাড়া সংঘাতহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচন করা সম্ভব নয়। কারণ, ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংঘাত হয়েই থাকে। জাতীয় নির্বাচন যেহেতু সংঘাতমুক্ত করা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তা পারব, সে আত্মবিশ্বাস আছে।’
কমিশন সে চেষ্টা করবে বলেও উল্লেখ করেন সিইসি।
সিইসি বলেন, ‘এ দেশের কিসে মঙ্গল, কিসে ভালো তা নিয়ে সর্বক্ষণ আমাকে ভাবা লাগবে। আমি সিইসি না হলেও বাসায় বসে তা চিন্তা করতাম। এ নিয়ে অনেক লেখালেখি করেছি। যেকোনো পরিস্থিতিতে দেশের মঙ্গল চিন্তা করি আমি। নির্বাচনপ্রক্রিয়াটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য...আমি চাচ্ছিলাম, নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতাটা যাক। জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতাটা যাক। তাদের পরিস্থিতি সামলাতে দিন। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকার বছরের পর বছর চলবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। গণতান্ত্রিক সরকার আসতেই হবে, যার মাধ্যমে সবকিছু করা সম্ভব হয়। দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।’