মোটরযান স্ক্র্যাপিং ও রিসাইক্লিং নীতিমালা
ইকোনমিক লাইফ (অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল) শেষ হওয়া মোটরযান স্ক্র্যাপ না করলে সেই মালিক নতুন বা পুরোনো কোনো মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন (নিবন্ধন) নিতে পারবেন না। তবে স্ক্র্যাপযোগ্য গাড়ি নিয়ে মালিকের আবেদন কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করলে, প্রয়োজন বিবেচনায় নতুন বা পুরোনো গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কর্তৃপক্ষ।
নতুন ‘মোটরযান স্ক্র্যাপিং ও রিসাইক্লিং নীতিমালা, ২০২৬’-এ এই বিধান রাখা হয়েছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার নীতিমালাটি চূড়ান্ত করে গেজেট আকারে প্রকাশ করে। এর ধারা ১২৪(থ) অনুযায়ী প্রণীত এই নীতিমালা প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে।
সরকার ২০২৫ সালের ১৯ জুন থেকে বাস ও মিনিবাসের ইকোনমিক লাইফ ২০ বছর এবং ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ পণ্যবাহী অন্যান্য মোটরযানের ইকোনমিক লাইফ ২৫ বছর নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ এখন এই সময়সীমা অতিক্রম করলে সংশ্লিষ্ট মোটরযানগুলোকে স্ক্র্যাপ করতে হবে।
মোটরযান স্ক্র্যাপিং ও রিসাইক্লিং নীতিমালায় বলা হয়েছে, ইকোনমিক লাইফ অতিক্রান্ত, চলাচলের অনুপযোগী, দীর্ঘদিন ফিটনেসবিহীন, অকেজো ঘোষিত বা অতিমাত্রায় দূষণকারী মোটরযান পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ায় স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে। এর লক্ষ্য সড়কে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ কমানো, টেকসই পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বৃত্তাকার অর্থনীতি উৎসাহিত করা।
নীতিমালায় স্ক্র্যাপযোগ্য মোটরযানের আওতায় থাকবে—নির্ধারিত ইকোনমিক লাইফ অতিক্রান্ত যান, সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অকেজো ঘোষিত যান, দুর্ঘটনা বা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ও মেরামত অযোগ্য যান, আদালতের আদেশে নিষ্পত্তি করা যান, অননুমোদিতভাবে উৎপাদিত বা পরিবর্তিত যান, যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া এক বছরের বেশি সময় ফিটনেসহীন যান এবং নির্ধারিত মান অতিক্রম করে দূষণকারী যান।
কীভাবে স্ক্র্যাপিং করা হবে, সে বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে, স্ক্র্যাপিং প্রক্রিয়ায় মালিককে নির্ধারিত ফরমে রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে। যাচাই শেষে যানটি কর্তৃপক্ষের নিয়োজিত বা অনুমোদিত ভেন্ডরের কাছে হস্তান্তর করা হবে। স্ক্র্যাপের আগে যানটির বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা দায় আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। চেসিস এমনভাবে বিনষ্ট করতে হবে, যাতে তা পুনরায় ব্যবহার করা না যায়। স্ক্র্যাপ সম্পন্ন হলে রেজিস্ট্রেশন নম্বর বাতিল করে কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে ভেহিক্যাল স্ক্র্যাপিং সার্টিফিকেট দেওয়া হবে।
স্ক্র্যাপ মূল্য নির্ধারণ ও রিসাইকেলযোগ্য অংশ চিহ্নিত করতে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হবে বলে নীতিমালায় বলা হয়েছে। ওই কমিটির সভাপতি থাকবেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) এবং সদস্যসচিব থাকবেন উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং)। এতে পরিবহন কমিশনারের প্রতিনিধি, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, একটি সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্র প্রকৌশলী এবং পরিবহনমালিক ও অটোমোবাইল ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিনিধিরা সদস্য থাকবেন। প্রয়োজনে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও কমিটি গঠন করা যাবে।
স্ক্র্যাপ ভেন্ডর নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালায় বলা হয়েছে, স্ক্র্যাপ ভেন্ডর উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ করা হবে। ভেন্ডরকে বিআরটিএতে নিবন্ধিত হতে হবে এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র, প্রয়োজনীয় জনবল এবং অন্তত ৫০টি মোটরযান সংরক্ষণের উপযুক্ত স্থান থাকতে হবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, স্ক্র্যাপ সার্টিফিকেটের বিপরীতে সরকার বিশেষ ক্ষেত্রে আর্থিক প্রণোদনা দিতে পারবে। নীতিমালা ভঙ্গ করলে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ধারা ১০৪ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্ক্র্যাপিং কার্যক্রম পরিচালনায় বিআরটিএতে পৃথক শাখা থাকবে এবং সব কার্যক্রম বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। নীতিমালার কোনো বিধান সংশ্লিষ্ট আইন বা বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে আইন ও বিধিমালাই প্রাধান্য পাবে।
২০২৩ সালের মে মাসে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ‘মোটরযান স্ক্র্যাপ নীতিমালা, ২০২৩’-এর একটি খসড়া প্রকাশ করেছিল। তবে পরিবহনমালিক ও শ্রমিকদের চাপের মুখে তখন সেটি আর বাস্তবায়ন করা হয়নি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘মোটরযান স্ক্র্যাপিং ও রিসাইক্লিং নীতিমালার গেজেট হওয়ার বিষয়টি আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। নীতিমালা চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি শেষ বৈঠক করার কথা থাকলেও তেমন কোনো বৈঠকে ডাকা হয়নি। আমাদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত করার কথা ছিল। কিন্তু সেটা না করে সরকারের শেষ সময়ে গেজেট করা হয়েছে।’
এই নীতিমালার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ যান দ্রুত স্ক্র্যাপ করলে সড়ক নিরাপত্তা বাড়বে এবং বায়ুদূষণ কমবে। এর আগে মালিকদের চাপের কারণে এই নীতিমালা বাস্তবায়িত হয়নি। তাই এ পরিস্থিতিতে বিআরটিএর উচিত হবে আরও স্বচ্ছভাবে স্ক্র্যাপিং প্রক্রিয়া পরিচালনা, স্ক্র্যাপ ভেন্ডরদের সক্ষমতা যাচাই করা, মালিকদের জন্য উপযুক্ত প্রণোদনা নিশ্চিত করা এবং মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা। যদি এসব ব্যবস্থা ঠিকভাবে নেওয়া হয়, তাহলে এই নীতিমালা সফলভাবে বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব।