হোম > জাতীয়

মাদকদ্রব্য পাচার: ১৮৭ উপজেলার ২৯৬ রুটে আসছে মাদক

আমানুর রহমান রনি, ঢাকা

প্রতীকী ছবি

রাজধানীর গাবতলীতে গত ১৩ জুলাই দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে কোডিনযুক্ত ৫৫০ বোতল এস্কাফ (নতুন মাদক) ও তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। আটক করা হয় এক চালককে। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, ভারত সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ সীমান্ত থেকে ওই চালান ঢাকায় আনা হয়। মাদক পাচারকারীরা প্রায়ই এই রুট ব্যবহার করছে।

সোনামসজিদ সীমান্ত মাদক পাচারের রুট হিসেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) লাল তালিকাভুক্ত। অধিদপ্তর মাদক পাচারের এমন ২৯৬টি রুট চিহ্নিত করেছে। এগুলো রয়েছে ৩৭ জেলার ১৮৭টি উপজেলায়। এর মধ্যে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তবর্তী ৩২ জেলার ৯৮ উপজেলাতে রয়েছে ২৪১টি রুট। ৩০টি জেলা ভারতের সীমান্তবর্তী। জেলাগুলো হলো—পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও জয়পুরহাট। মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তবর্তী জেলা হলো—রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার। অর্থাৎ রাঙামাটি দুই দেশেরই সীমান্তবর্তী।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকায় দেখা গেছে, ৯২ উপজেলার ২১২টি রুট ব্যবহার করে ভারত থেকে হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা ও ট্যাপেন্টাডলের পাশাপাশি কোডিনযুক্ত এস্কাফসহ (ফেনসিডিলের মতো) নতুন ধরনের সিরাপ এবং বিদেশি মদ পাচার হয়ে দেশে ঢুকছে। ৬ উপজেলার ২৯টি রুট দিয়ে মিয়ানমার থেকে প্রধানত ইয়াবা (মেথামফেটামিন) ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইস বাংলাদেশে পাচার করা হয়। গাঁজাসহ অন্যান্য মাদক পাচারের তথ্যও রয়েছে। মিয়ানমার থেকে এসব রুটে হেরোইন ও আফিম পাচারের ঝুঁকিও রয়েছে। এ ছাড়া নৌপথে পটুয়াখালী, বরগুনা ও কক্সবাজারের ১৪ রুট দিয়েও মাদকদ্রব্য ঢুকছে। আকাশপথে দেশের তিনটি বিমানবন্দর দিয়েও মাদক পাচার হচ্ছে।

অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী, দেশের আট বিভাগের মধ্যে মাদক পাচারের সবচেয়ে বেশি রুট রাজশাহী বিভাগে। এ বিভাগের ৩৭ উপজেলায় ৮১টি রুট রয়েছে। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগের ৪২ উপজেলায় ৬৪ রুট, ঢাকা বিভাগের ২৭ উপজেলায় ৪২ রুট, খুলনা বিভাগের ১৮ উপজেলায় ৩৫ রুট, রংপুর বিভাগের ২৫ উপজেলায় ২৫ রুট, সিলেট বিভাগের ১৯ উপজেলায় ২০ রুট, ময়মনসিংহ বিভাগের ১১ উপজেলায় ১৬ রুট এবং বরিশালের ৮ উপজেলায় ১৩ রুট ব্যবহার হচ্ছে।

ডিবি পুলিশ জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও সোনামসজিদ সীমান্ত মাদক পাচারের রুট হিসেবে চিহ্নিত। এই রুট ব্যবহার করা মাদক পাচারকারী চক্রটি ভারত থেকে ঢোকা মাদকদ্রব্য সোনামসজিদ সীমান্ত থেকে কানসাট, শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, গোদাগাড়ী হয়ে রাজশাহীতে নেয়। পরে সেগুলো ঢাকায় আনা হয়। সোনামসজিদ সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার মহদীপুর। বিস্তীর্ণ ওই এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে ফেনসিডিল, এস্কাফ সিরাপ, গাঁজা এবং বিভিন্ন ট্যাবলেট ও ইনজেকশন বাংলাদেশে পাচার করা হয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকায় দেখা গেছে, ওই রুটসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচ উপজেলার চারটিতে মাদক পাচারের পাঁচটি রুট রয়েছে। এর মধ্যে সোনামসজিদ এলাকা থেকে কানসাট, গোমস্তাপুরের চৌডালা, আড্ডা হয়ে নওগাঁয় মাদক নেওয়া হয়। সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। তেলকুপি ও আজমতপুর সীমান্ত দিয়ে মাদক পাচার করে বিনোদপুর, কানসাটে নিয়ে চৌডালায় অন্য বাহককে দেওয়া হয়। চৌডালা থেকে গোমস্তাপুর ও আড্ডা হয়ে নওগাঁয় নিয়ে হাতবদল করা হয়। এ ছাড়া সীমান্ত থেকে পাচারের পর ভোলাহাট, গোমস্তাপুর ও রহনপুর হয়ে আড্ডা পর্যন্ত একদল কারবারি পোরশা দিয়ে মাদক নওগাঁ নেয়। ভোলাহাট থেকে শিবগঞ্জ দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হয়ে রাজশাহীতে পাচার করা হয়। রাজশাহী ও নওগাঁ থেকে সড়ক, আকাশ ও রেলপথে ঢাকায় আনা হয়।

ভারতের সীমান্তবর্তী উপজেলার রুটগুলোর মধ্যে কুমিল্লার আদর্শ সদর, বিবির বাজার, কটক বাজার, নিশ্চিতপুর, মতিনগর, জামবাড়ি ও বিষ্ণুপুর রয়েছে। আদর্শ সদর উপজেলার ওপারে ভারতের ত্রিপুরার আগরতলা। ওই উপজেলার গাজীপুর, গোলাবাড়ী, শাহাপুর ও বিবিরবাজার সীমান্তের ওপারে ভারত। ৫ অক্টোবর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম সীমান্ত এলাকায় একটি মাইক্রোবাস তল্লাশি চালিয়ে ৯০ কেজি গাঁজা ও ৬০ বোতল মদ উদ্ধার করে বিজিবি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানায়, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, নোয়াখালী, রাজশাহী, পাবনা, সাতক্ষীরা, যশোর, রংপুরের বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে ভারত থেকে মাদক পাচার করা হয়।

ভয়ংকর মাদক হিসেবে পরিচিত ইয়াবা ও আইস পাচারে বেশি ব্যবহার করা হয় কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া এবং বান্দরবান সীমান্ত এলাকা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইয়াবা পাচারের জন্য টেকনাফ, উখিয়া ও বান্দরবানের স্থলপথে ২৯টি রুট ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে সর্বাধিক ব্যবহৃত রুট ঘুমধুম, হ্নীলা, হোয়াইক্যং, তমব্রু, কুতুপালং, মরিচ্যা ও গোয়ালিয়া পালং উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া নৌপথে নাফ নদী পার করে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় পাচার করা হয়।

নৌপথেও মাদক পাচার

মিয়ানমারের গভীর সমুদ্র থেকে ট্রলারের মাধ্যমে মাদক এনে বঙ্গোপসাগর হয়ে মহেশখালী, সেন্ট মার্টিন, কুতুবদিয়া, চকরিয়া এবং পেকুয়ার উপকূলী এলাকায় খালাস করা হয়। আরেকটি নৌরুট হলো—কক্সবাজারের নাহিরারটেক, কস্তুরাঘাট বা নুনিয়ারছড়া থেকে মাছ ধরার ট্রলারে করে মাদক মহেশখালী ও কুতুবদিয়া হয়ে সরাসরি চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা বা পতেঙ্গা উপকূল হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানায়, বঙ্গোপসাগর ব্যবহার করে মিয়ানমার থেকে মাছ ধরার বড় ট্রলারে করে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক কক্সবাজারের উপকূল থেকে সরাসরি চট্টগ্রামের বহির্নোঙর, সীতাকুণ্ড, সন্দ্বীপ এবং কখনো কখনো বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা ও তৎসংলগ্ন এলাকা হয়ে পাচার করা হয়। আকাশপথে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও রুট হিসেবে ব্যবহার করে মাদক পাচারকারীরা।

অধিদপ্তর জানায়, গত এক বছরে সীমান্তবর্তী জেলায় তারা ৪২ হাজার ২২২টি অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে ১১ হাজার ৯৬৮টি মামলা হয়েছে এবং ১২ হাজার ৩২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে ৮ লাখ ১ হাজার ৫৬৫টি এটিএস জাতীয় ট্যাবলেট, ২ হাজার ৮৭০ দশমিক ২৩৯ কেজি গাঁজা, ৬ দশমিক ৭৭২ কেজি হেরোইন, ৬ হাজার ৮৯২ বোতল ফেনসিডিল এবং ৮২ হাজার ৯২টি ট্যাপেন্টাডল।

একই সময়ে সারা দেশে অধিদপ্তরের ১ লাখ ৪ হাজার ৮৪৩টি অভিযানে ২৮ হাজার ৪০৯টি মামলা এবং ৩০ হাজার ১৬১ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে ৪৭ লাখ ৭২ হাজার ১২২টি এটিএস-জাতীয় ট্যাবলেট, ৬ হাজার ৯৩৮ দশমিক ১৩৪ কেজি গাঁজা, ১৮ দশমিক ১০৪ কেজি হেরোইন, ১২ হাজার ২১৯ বোতল ফেনসিডিল এবং ১ লাখ ২০ হাজার ৭৫৪টি ট্যাপেন্টাডল।

তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে যা ধরা পড়ে তার কয়েক গুণ মাদক দেশে ঢুকছে।

অধিদপ্তরের মতে, সীমান্ত দিয়ে মাদকদ্রব্য প্রবেশ বন্ধ করতে উৎস এলাকা, ট্রানজিট পয়েন্ট এবং সীমান্ত অতিক্রমের স্থান—তিন পর্যায়েই সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ও মিয়ানমারের মাদকবিরোধী সহযোগিতার জন্য সমঝোতা স্মারক রয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর গোয়েন্দা তথ্যবিনিময়, যৌথ অভিযান এবং সীমান্তে সমন্বিত নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে অধিদপ্তর।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হাসান মারুফ বলেন, বিশেষ করে চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ রুটগুলোতে প্রতিবেশী দেশগুলোর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান করা হয়। যাতে মাদকের চালান বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই প্রতিরোধ করা যায়, সে জন্য কাজ করছেন তাঁরা।