হোম > জাতীয়

পাঁচ জেলায় অভিযান: কিশোর গ্যাং আত্মগোপনে শঙ্কা কাটেনি জনমনে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

প্রতীকী ছবি

কিশোর অপরাধ দমনে পুলিশের অভিযানের পর কমেছে কিশোরদের দলবদ্ধ আড্ডা, মোটরসাইকেল মহড়া ও প্রকাশ্য আধিপত্য প্রদর্শন। কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুরে এমন ধারাবাহিক অভিযানের কারণে অনেক কিশোর গ্যাং সদস্য আত্মগোপনে চলে গেছে। পুলিশের ভাষ্য, বেশ কিছু গ্যাংয়ের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ ছাড়া এসব গ্যাংয়ের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের প্রশ্রয়। ফলে এ অভিযানের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এই পাঁচ জেলার পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এসব জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে সাড়ে ৫ হাজার তরুণ ও কিশোরকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ১৮ জনকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তবে এরপরও কিছু কিছু এলাকায় রাজনৈতিক আশ্রয়ে এখনো সক্রিয় কিশোর গ্যাং।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের পর কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি আবারও ব্যাপক আলোচনায় আসে। এরপর শুরু হয় কুমিল্লায় কিশোর অপরাধবিরোধী অভিযান। এই অভিযানে এ পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের ৯ মূল হোতাসহ মোট ২ হাজার ৩৪৬ জনকে আটক করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৪০৯ জনকে অভিভাবকের জিম্মায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগে ৬৩৩ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কুমিল্লা পুলিশের ভাষ্য, ধারাবাহিক অভিযানের কারণে অনেক কিশোর গ্যাং সদস্য আত্মগোপনে চলে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় আগের মতো প্রকাশ্যে দলবদ্ধভাবে ঘোরাফেরা বা আধিপত্য বিস্তারের দৃশ্যও কমেছে। তবে বেশ কিছু গ্যাংয়ের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সাম্প্রতিক অভিযানের পর এসব এলাকার অনেক স্থান থেকেই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা সরে গেছে। পুলিশের টহল ও উপস্থিতি বাড়ায় দলবদ্ধ আড্ডা, মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া এবং প্রকাশ্যে প্রভাব বিস্তারের ঘটনা কমেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

কুমিল্লার সাংস্কৃতিক কর্মী সামস আল মামুন বলেন, শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার নয়, তাদের পেছনে কারা রয়েছে, সেটিও খুঁজে বের করা জরুরি।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ আহমেদ জিতু বলেন, কিশোর গ্যাং দমনে শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়; পরিবার ও সমাজকেও দায়িত্ব নিতে হবে। কিশোরদের অপরাধে ব্যবহারের অভিযোগের পাশাপাশি তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করতে হবে।

তবে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম বলেন, বর্তমান সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কোনো নেতা-কর্মী কিশোর গ্যাংকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, অপরাধীদের পাশাপাশি তাদের নেতৃত্বদানকারী ও পৃষ্ঠপোষকদেরও চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য পুলিশের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।

চট্টগ্রামে পৃষ্ঠপোষকতায় সক্রিয়

গত সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ কিশোর অপরাধ দমনে চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযানে নামে পুলিশ। তবে চট্টগ্রামে পুরোনো তালিকা এবং থানাভিত্তিক করা তালিকা ধরেই কিশোর গ্যাং-বিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের মুখপাত্র মো. রাসেল আজকের পত্রিকাকে বলেন, জেলায় নির্দিষ্টভাবে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যাটি বলা যাচ্ছে না। কিশোর গ্যাংয়ের নতুন করে একটি তালিকা তৈরির কাজ করছে ডিএসবি।

চলমান অভিযানে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ১ হাজার ৭০ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯৭৭ জনকে মুচলেকা দিয়ে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দিয়েছে, বাকি ৯৩ জনকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের মুখপাত্র সহকারী কমিশনার মো. আমিনুর রশীদ বলেন, ইতিমধ্যে কিশোর গ্যাংগুলোর প্রশ্রয়দাতা অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযান এখনো চলমান রয়েছে।

স্থানীয় পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, এখনো বেশ কিছু গ্যাংয়ের সদস্যরা সক্রিয়। তাদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়ে সক্রিয়।

নোয়াখালীতে জনমনে আতঙ্ক কাটেনি

নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংয়ের চিত্র ভিন্ন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনার দেয়ালে চিকা মেরে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিলস ছেড়ে আতঙ্কিত করা হচ্ছে জনসাধারণকে। টাকার বিনিময়ে এখনো চলছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। এ ছাড়া ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ইভ টিজিংসহ বিভিন্ন অপরাধে এখনো সক্রিয় কিশোরেরা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৪ জনকে আটক করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ৯৫৮ জনকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং ৮৬ জনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

লক্ষ্মীপুরে ৫০টি গ্যাং

লক্ষ্মীপুরে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য কমাতে ৩০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিনের অভিযানে ৬৫৩ জনকে আটক করে জেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তবে জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, জেলায় প্রায় ৫০টি কিশোর গ্যাং চক্র সক্রিয় রয়েছে। এদের সদস্যসংখ্যাও এক হাজারের বেশি। এখন পর্যন্ত মূল হোতাদের আটক করা যায়নি।

গত মঙ্গলবার সকালে পৌর শহরের বালিকা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে, ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বাগবাড়ি, নতুন সরকারি মহিলা কলেজ ক্যাম্পাস এলাকা, চন্দ্রগঞ্জে প্রতাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয়, মান্দারী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ১৪ থেকে ১৮ বছরের কিশোর-তরুণদের আড্ডা চলছে। সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনের দোকানে ৮-১০ জন কিশোরকে বসে চা পান করতে দেখা যায়। স্কুল ছুটির পর ছাত্রীদের পিছু নিতে দেখা যায় তাদের।

এ সময় দুজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা জানান, কিশোরদের বিরুদ্ধে ভয়ে অনেকেই কথা বলছে না। কারণ, হঠাৎ কিছু বললে মারধর করে।

পুলিশ সুপার আবু তারেক বলেন, কিশোর গ্যাংদের মূল শেল্টারদাতাদের খোঁজা হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

পরিস্থিতি বদলেছে চাঁদপুরে

চাঁদপুরে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অভিযান শুরুর পর পরিস্থিতি খানিকটা বদলেছে। সরেজমিন শহরের অঙ্গীকার পাদদেশ, শহীদ মিনারসংলগ্ন রেললাইন, হাসান আলী উচ্চবিদ্যালয় মাঠ, শহরের মিশন রোড, প্রেসক্লাব-সংলগ্ন নদীর পাড় এলাকায় কিশোরদের আড্ডার দেখা মেলেনি। স্থানীয়রা বলছেন, অভিযানের আগে অধিকাংশ কিশোর এসব স্থানে আড্ডা দিত।

চলমান এই অভিযানে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৬২৭ জনকে আটক করা হয়। পরিবারের মুচলেকায় সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান সম্পর্কে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নাদিয়া নূর বলেন, ‘জেলায় কিশোর গ্যাং কত, এমন সংখ্যা আমাদের কাছে নেই। তবে গত ২৭ সেপ্টেম্বর অভিযানের পর থেকে তিনটি অভিযানের পরে ওই সব স্থানে কিশোরদের আড্ডা এখন নেই।’

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম; কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি]