ব্যবসায়িক স্বার্থ, রাজনৈতিক চাপ এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশের গণমাধ্যম পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না বলে মন্তব্য করেছেন দৈনিক সমকাল ও চ্যানেল ২৪ এর প্রকাশক এ কে আজাদ।
তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যম মালিকদের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রায়ই নানা ধরনের চাপ মোকাবিলা করতে হয়। কেউ বলতে পারবে না, গণমাধ্যম স্বাধীন।’
আজ শনিবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর শেষদিনের দ্বিতীয় সেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে এসব কথা বলেন এ কে আজাদ।
এই সেশনে আলোচনার বিষয় ছিল, ‘মিডিয়া সেলফ রেগুলেশন ইন বাংলাদেশ: প্রফেশনাল ওভারসাইট, একাউন্টটিবিলিটি অ্যান্ড গ্রিভেন্স রেডেসেলাল’। সেশনটির সঞ্চালক ছিলেন বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার। দু’দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এই কনফারেন্সের আয়োজক মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)।
আলোচনায় এ কে আজাদ জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাংবাদিকেরা পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি ব্যবসায়িক বাস্তবতার কথা উল্লেখ করেন।
এ কে আজাদ বলেন, তাঁর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৭৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন এবং তাঁদের স্বার্থ রক্ষা করাও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তিনি বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে হলে দীর্ঘ সময় ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন হয়। কোনো দুর্নীতির তথ্য প্রকাশের আগে সাংবাদিকদের সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নিতে হয়। আর তখন থেকেই চাপ শুরু হয়। তাঁর ভাষায়, ‘যার বিরুদ্ধে সংবাদ হবে, প্রথম ফোনটাই আসে আমার কাছে—যেন কোনোভাবেই সংবাদটি প্রকাশ না করা হয়।’
এ কে আজাদ অভিযোগ করেন, সরাসরি চাপ দিয়ে কাজ না হলে অনেক সময় প্রভাবশালী মহল, গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদেরও ব্যবহার করা হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যম মালিকদের ওপর এমন চাপ তৈরি হয়, যেখানে সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার আটকে দেওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, কোনো সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করে দিলে সাংবাদিকদের মধ্যেও সংকট তৈরি হয়। কারণ তথ্যদাতারা তখন মনে করতে পারেন যে কোনো ধরনের সমঝোতার বিনিময়ে সংবাদটি গোপন করা হয়েছে। এতে সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সমকাল প্রকাশক বলেন, ‘আমি যে চিন্তা ও সচেতনতা নিয়ে গণমাধ্যম শুরু করেছিলাম, বাস্তবতার চাপে অনেক সময় তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়।’ তবে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে গণমাধ্যম মালিকদেরও নিরাপত্তা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ কে আজাদ বলেন, যদি নিশ্চয়তা দেওয়া হয় যে কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হয়রানির শিকার হবে না, শিল্পকারখানায় চাপ সৃষ্টি করা হবে না কিংবা মালিকদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তাহলে মালিকদেরও সাংবাদিকদের কাজ থামানোর প্রয়োজন পড়বে না।
আলোচনায় তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কালো টাকার মালিকদের হাতে গণমাধ্যমের মালিকানা ক্রমশ চলে যাচ্ছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য বড় হুমকি। এ কে আজাদের মতে, কিছু গণমাধ্যম এখনো নীতিগত অবস্থান ধরে রাখলেও ধীরে ধীরে সেগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে।
সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা ও নিয়মিত বেতনের নিশ্চয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন এ কে আজাদ। তিনি বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখতে হলে সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মালিকপক্ষকেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে হবে।
গণমাধ্যম মালিকদের উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেউ কেউ সমাজের দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থ পাচারের মতো বিষয় সামনে আনতে গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করেন। আবার কেউ কেউ নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা এবং প্রভাব বিস্তারের জন্যও গণমাধ্যমের মালিক হন।
আলোচনায় অংশ নেওয়া সঞ্চালক এ সময় প্রশ্ন তোলেন, মালিকদের উপস্থিতি কি অনেক ক্ষেত্রে সংবাদকক্ষের স্বাধীনতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না? জবাবে এ কে আজাদ বলেন, ‘আংশিকভাবে হলেও সেটি সত্য।’