‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে গুলিতে আহত হয়ে হাসপাতালের আরসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় পুলিশ ও ছাত্রলীগের সদস্যরা অস্ত্রসহ সেখানে ঢুকে গালাগালি করেন। তাঁরা আহত ব্যক্তিদের ছবি তোলেন এবং মামলা করেন।’
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সারা দেশে চালানো হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দেওয়ার সময় ট্রাইব্যুনালে এসব কথা বলেন আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ আবু জুহামুল ইসলাম। আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তাঁর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।
এদিন আরও জবানবন্দি দেন আন্দোলনে নিহত আনোয়ার হোসেন পাটোয়ারীর বাবা আল আমিন পাটোয়ারী। তিনি ছেলে হত্যার ন্যায়বিচার চান।
গত বছরের ৪ ডিসেম্বর এই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। আর গত ১২ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ১০ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিচার কার্যক্রম।
১৮ বছর বয়সী আবু জুহামুল ইসলাম জবানবন্দিতে বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। পুলিশ, আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের সদস্যরা আন্দোলনকারীদের ওপর টিয়ার শেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ করে। ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর একই স্থানে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা জমায়েত হয়। ওই দিন বিজিবি ও পুলিশ আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর গুলি করে এবং র্যাব হেলিকপ্টার থেকে গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগও ছিল। সেদিন তিনি চোখের সামনে অনেককে আহত এবং কয়েকজনকে নিহত হতে দেখেন।
জুহামুল ইসলাম বলেন, ২০ জুলাই সারা দেশে কারফিউ ছিল। দুপুর ১২টার পর কারফিউ শিথিল হলে মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র্যাব এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ অবস্থান গ্রহণ করে। আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা মিরপুরের অলিগলিতে অবস্থান নেয়। তিনি ছাত্র-জনতার সঙ্গে গলিতে অবস্থান করেন। বেলা দেড়টার দিকে একটি গুলি তাঁর বুকের ওপরের অংশে বাঁ দিকে বিদ্ধ হয়ে হাড় ভেঙে ডান দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। (সাক্ষী তাঁর শরীরের ক্ষতচিহ্ন ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করেন)। গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেলে রক্তপাত হতে দেখে দুজন রিকশাওয়ালা কাজীপাড়ায় একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান তাঁকে। চিকিৎসকেরা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রক্তপাত বন্ধ করতে না পেরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অথবা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যেতে বলেন। পরে বিআরটিসি বাসের একজন ড্রাইভার ও আরেকজন স্কুলছাত্র তাঁকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যান।
জুহামুল বলেন, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যাওয়ার পর সেখানে অনেক হতাহত দেখতে পান তিনি। তাঁকে অস্ত্রোপচার কক্ষে নেওয়া হলে অবস্থা মারাত্মক দেখে চিকিৎসকেরা মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে যেতে বলেন। পরে তাঁকে মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর রাখা হয় আরসিইউতে। পরদিন সকালে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সদস্যরা অস্ত্রসহ হাসপাতালের আরসিইউতে প্রবেশ করে গালাগালি করতে থাকেন। তাঁরা ছবি তোলেন এবং মামলা দেন।
জবানবন্দিতে জুহামুল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানকে দায়ী করে তাঁদের বিচার দাবি করেন।
সেনা কর্মকর্তাদের সেনা আইনেই বিচার সম্ভব: আইনজীবী
বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক তিন মামলার বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁদের আইনজীবী এ বি এম হামিদুল মিসবাহ। আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, তিনটি মামলা ট্রাইব্যুনালের অধিক্ষেত্রের মধ্যে পড়ে না। যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে তা মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে পড়ে না। আসামিরা সার্ভিং আর্মি অফিসার। সেনা আইনেই তাঁদের বিচার হতে পারে।