হোম > জাতীয়

উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহার বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যা: মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে ‘ওয়াটার, রিভার্স, অ্যান্ড রিজিওনাল ডিপ্লোমেসি’ শীর্ষক সেশনে বক্তব্যে রাখছেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী। ছবি: আজকের পত্রিকা

শুষ্ক মৌসুমে উজানে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী।

আজ সোমবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ছিল সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬ ’-এর সমাপনী দিনে ‘ওয়াটার, রিভার্স, অ্যান্ড রিজিওনাল ডিপ্লোমেসি’ শীর্ষক সেশনে বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি আরও বলেন, নদীদূষণ, দখল, অবৈধ বালু উত্তোলন ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণেও দেশের নদীগুলো নানা সংকটে রয়েছে।

মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, শহর ও শিল্পাঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলো জৈব ও অজৈব দূষণ এবং ভারী ধাতুর দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর পাশাপাশি নদীভাঙন, অবৈধ বালু উত্তোলন ও নদী দখলও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে আন্তসীমান্ত নদীর সংখ্যা নিয়ে সাধারণত ৫৪টি নদীর কথা বলা হলেও বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি। এসব নদীর মাধ্যমে দূষণও বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে উজানে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের কারণে দেশের পানি নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিস্তা নদীর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানির পরিমাণ খুব কম থাকে, আবার বর্ষায় অতিরিক্ত পানি আসে। এ ধরনের পরিস্থিতি নদী অববাহিকার মানুষের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করছে।

নদীতে বাঁধ নির্মাণের প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ জানান মঞ্জুর। তিনি বলেন, বাঁধে পানি আটকে রাখার ফলে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে পানির ক্ষতি হয়। আবার অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় বাঁধের চাপ কমাতে পানি ছেড়ে দিলে উজান ও ভাটিতে বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এসব ঘটনাকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; মানুষের কর্মকাণ্ডও এর জন্য দায়ী।

বাংলাদেশের নদী রক্ষায় নিজেদের কর্মকাণ্ডেরও সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর মতে, জলাধার ও নিম্নাঞ্চলের ওপর সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অনেক মাঝারি আকারের নদী নাব্য হারিয়ে নৌ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নদী অব্যবহৃত হলে সেখানে দখল ও অবৈধ ব্যবহার বাড়তে থাকে।

নদী রক্ষায় আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, কোনো নদীকে নদী হিসেবে চিহ্নিত করাই প্রথম কাজ। এরপর তাকে আইনি সুরক্ষা দিতে হবে এবং নদী দূষণবিরোধী আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। দেশে এ বিষয়ে অনেক আইন থাকলেও সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

পানি বণ্টন চুক্তির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানিবণ্টনসংক্রান্ত একটি চুক্তির মেয়াদ এ বছরের ১১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে সেটি নবায়নের প্রক্রিয়া ধীর গতির হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

মঞ্জুর বলেন, বিদ্যমান চুক্তিতে পানির পরিবেশগত প্রবাহ বা ‘ইকোলজিক্যাল ফ্লো’ নিশ্চিত করার বিষয়টি নেই। শুধু একটি নির্দিষ্ট স্থানে পানির পরিমাণ ভাগ করে না দিয়ে পুরো নদী অববাহিকাকে বিবেচনায় নিয়ে পানির হিসাব করতে হবে।

তাঁর মতে, বিদ্যমান চুক্তি আপাতত দুই-তিন বছরের জন্য নবায়ন করে এ সময়ের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনা চালানো যেতে পারে। তথ্য আদান-প্রদান ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে পৌঁছাতে হবে। কারণ চুক্তি না থাকার পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য আরও ক্ষতিকর হতে পারে।

আঞ্চলিক পানি কূটনীতির জন্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি আলাদা কাঠামো গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি। এ ব্যবস্থায় জলবিদ, নদীবিজ্ঞানী, আন্তর্জাতিক নদী আইন বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের রাখার কথা বলেন তিনি।

ফারাক্কা বাঁধের কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়নেরও আহ্বান জানান মঞ্জুর। তিনি বলেন, ফারাক্কা নির্মাণের প্রায় ৫০ বছর হয়ে গেছে। তাই এটি ভারতের জন্য কতটা কার্যকর এবং বাংলাদেশের ওপর এর কী প্রভাব পড়ছে, তা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ফারাক্কা ধ্বংস নয়, ‘ডিকমিশন’ বা কার্যক্রম বন্ধ করার বিষয়টি পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

সেশনে আরও বক্তব্য রাখেন নাইজেরিয়ার এনগালাসি সেন্টার ফর কোহেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থনি জুড উচে ইগওয়ে এবং পাকিস্তানের ব্লু গ্রিন নেক্সাস প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক মুহাম্মদ আজিম আলী শাহ। অস্ট্রেলিয়ার অস্ট্রেলিয়া-ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফেলো গ্রেস ক্যাথেরিন করকোরান সেশনটি সঞ্চালনা করেন।