তিন দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জরুরি বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল। সফরকালে তিনি ঢাকার কড়াইল বস্তির পরিবারগুলোর পাশাপাশি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
সফর শেষে রাসেল শিশুদের কল্যাণে তিনটি বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। এগুলো হলো—শিশুবিবাহ বন্ধ করে মেয়েদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ বিনিয়োগের সরকারি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা।
ঢাকার কড়াইল বস্তিতে শিশু ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন ক্যাথরিন রাসেল। এ সময় তিনি দারিদ্র্য, পড়াশোনার প্রতিবন্ধকতা ও মৌলিক সেবার সীমিত সুযোগের বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা শোনেন।
রাসেল বলেন, ‘বুশরা নামের ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। সে আমাকে জানায়, ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত একটি শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রের কমিউনিটি নেতারা তার বাবাকে সঙ্গে নিয়ে তাকে শিশুবিবাহ থেকে রক্ষা করেন। মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং তাদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে তা তাদের, তাদের কমিউনিটির এবং বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে সহায়তা করবে।’
বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। শিশুবিবাহের ফলে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অল্প বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ে এবং জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
এ পরিস্থিতিতে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং শিশুবিবাহের সুযোগ তৈরি করে এমন আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ।
সফরকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ক্যাথরিন রাসেল। এ সময় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সরকারি অঙ্গীকারের প্রশংসা করেন তিনি। একই সঙ্গে এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রাসেল বলেন, বাজেটের মধ্য দিয়েই অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হয়। শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সুরক্ষায় বিনিয়োগ মানে বাংলাদেশের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ।
বাংলাদেশ সফরের অংশ হিসেবে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক। এ সময় তিনি সংস্থাটির সহায়তায় পরিচালিত শিক্ষামূলক কার্যক্রমও পরিদর্শন করেন।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের উদারতার প্রশংসা করে রাসেল শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা—উভয় জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত একটি শিক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শনকালে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন রাসেল। সেখানে তিনি শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক দক্ষতা অর্জনের গুরুত্ব সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা শোনেন। তিনি বলেন, শিক্ষা শুধু জ্ঞান অর্জনের সুযোগই তৈরি করে না, বরং শিশুদের শোষণ, পাচার, শিশুবিবাহ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগের ঝুঁকি থেকেও সুরক্ষা দিতে সহায়তা করে।
রাসেল আরও বলেন, সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার কারণে রোহিঙ্গা শিশুরা অনেক কিছু হারিয়েছে। এখন তাদের শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হতে হবে—এটা হতে দেওয়া যাবে না। তাদের ও যে কমিউনিটি তাদের আশ্রয় দিয়েছে, তাদের জন্য বিশ্বকে অবশ্যই বিনিয়োগ করতে হবে।
সারা দেশে শিশু ও পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা ও ব্যবস্থা জোরদার করতে সরকার এবং সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করছে ইউনিসেফ। সংস্থাটি মানসম্মত শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, পুষ্টি, নিরাপদ পানি, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমে সহায়তা দিচ্ছে।
এ ছাড়া শিশুবিবাহ ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, কিশোরীদের ক্ষমতায়ন, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং শিশুদের জন্য সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতেও কাজ করছে সংস্থাটি। তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন, নীতিনির্ধারণে সহায়তা এবং জাতীয় ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের কাছে জরুরি সেবা পৌঁছে দিতে সহায়তা করছে।
কক্সবাজারে ইউনিসেফ ও সহযোগী সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু ও তাদের পরিবারকে জীবন রক্ষাকারী ও জরুরি সেবা দিয়ে থাকে। এসব সেবার মধ্যে রয়েছে অপুষ্টি প্রতিরোধ ও চিকিৎসা, নিরাপদ খাবার পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিশু সুরক্ষা এবং মানসিক সহায়তা। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীকেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তবে মানবিক সহায়তার তহবিল কমে যাওয়ায় এসব জরুরি সেবা সচল রাখা, অর্জিত অগ্রগতি ধরে রাখা এবং শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর শিশুরা যাতে পিছিয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক কমিউনিটির ধারাবাহিক সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।