ভ্রমণ কেবল নতুন স্থান দর্শনের আনন্দই দেয় না, মাঝে মাঝে সামনে নিয়ে আসে নানা অদ্ভুত ও বিস্ময়কর বাস্তবতা। এ বছর যেমন বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান আলোচনায় উঠে এসেছে, তেমনই উঠে এসেছে নতুন নতুন ভ্রমণ ট্রেন্ড। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে ভুয়া নিদর্শন তৈরির ঘটনা নতুন নয়। তবে কিছু জায়গা আসলেই পর্যটকের মন কেড়েছে আর কিছু জায়গা শুধুই পকেট কেটেছে। যেমন উত্তর ইতালিতে ফ্রাঙ্কো মালোসো নামের এক ব্যক্তি প্রায় ৫৪ হাজার বর্গফুটের একটি কৃত্রিম গ্রিক অ্যাম্পিথিয়েটার নির্মাণ করেন এবং কটেজ থার্মোকল ও স্টাইরোফোমের ব্যবহার করে এটিকে প্রাচীন রূপ দেন। এরপর তিনি সেখান থেকে টিকিটপ্রতি ৪৬ ডলার করে পর্যটকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন। দীর্ঘ এক দশক ধরে এই প্রতারণা চালানোর পর সম্প্রতি জালিয়াতির অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তার হন।
সব কৃত্রিম স্থান আবার বেআইনি বা অপ্রিয় নয়। যেমন ভ্যারোনা ও জুলিয়েটের বারান্দা। শেক্সপিয়ারের কাল্পনিক চরিত্র জুলিয়েট ক্যাপিউলেটের স্মরণে ইতালির ভ্যারোনা শহরে একটি ঐতিহাসিক ব্যালকনি স্থাপন করা হয়েছে। এই বারান্দাটির কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। শেক্সপিয়ার কখনো ভেরোনা শহরে যাননি। এটা সম্পূর্ণ কাল্পনিক হলেও ইতালির অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রেমপত্র টাঙানো এবং সৌভাগ্যের আশায় জুলিয়েটের মূর্তিতে স্পর্শ করার জন্য প্রতিদিন হাজারো রোমান্টিক পর্যটক এখানে ভিড় জমান।
সমুদ্রের পানিতে খুঁটি বা কাঠ পুঁতে মাছ ধরার এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি ২০০৪ সালের সুনামির পর অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে সমুদ্রসৈকতের কাছে যেসব জেলেকে এভাবে দেখা যায়, তাঁরা মূলত অর্থ ও বকশিশের বিনিময়ে ছবি তোলার জন্য পোজ দেওয়া অভিনেতা। একই ধরনের কৃত্রিম বাণিজ্যিক প্রদর্শন দেখা যায় মিয়ানমারের ইনলে লেক ও ভারতের কোচির মাছ ধরার জালে।
১৯৩৩ সালের ‘লস্ট হরাইজন’ উপন্যাসের কাল্পনিক ও স্বর্গীয় ‘সাংগ্রি-লা’ স্থানটির বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ২০০১ সালে চীনের জংদিয়ান শহরের নাম বদলে রাখা হয় ‘সাংগ্রি-লা’। নাম কৃত্রিম হলেও হিমালয়ের পাদদেশে তিব্বতি সংস্কৃতির অনন্য অভিজ্ঞতা নিতে পর্যটকেরা এখানে যান। এ ছাড়া চীনের ‘ফ্যাংগু’ বা নকল গ্রাম পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সফল হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড সুন্দর দেখাতে চীনে ঐতিহাসিক ধাঁচে এই নকল বা ‘ফ্যাংগু’ গ্রামগুলো তৈরি করা হয়। এখন তরুণ পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় স্থান এই জায়গাটি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত কুখ্যাত ‘ডেথ রেলওয়ে’ বাস্তবেই নির্মিত হয়েছিল। তবে ১৯৫৭ সালের বিখ্যাত চলচ্চিত্রের কারণে পর্যটকেরা যখন ‘কাওয়াই নদী’ খুঁজতে আসেন, তখন থাই সরকার ‘মে ক্লং’ নদীর অংশটির নাম বদলে ‘কাওয়াই ইয়াই’ রেখে দেয়। স্থানটি ভুল হলেও ক্যানচানাবুরির এই এলাকাটির ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক গুরুত্ব এখনো অতুলনীয়।
পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের সীমান্ত অতিক্রমের ঐতিহাসিক স্থান চেকপয়েন্ট চার্লি। জায়গাটি সত্য হলেও, বর্তমানে সেখানে থাকা বুথ, বালুর বস্তা এবং সেনার পোশাকে থাকা অভিনেতারা সম্পূর্ণ নতুনভাবে কৃত্রিমভাবে তৈরি। মূল স্মৃতিচিহ্নের স্মারক বদলে এটি এখন ক্যাফে, স্যুভেনির শপ এবং ছবি তোলার জায়গায় পরিণত হয়েছে। এদিকে জার্মানির ড্রেসডেনে ১৭৪৩ সালের ঐতিহাসিক চালচিত্রের মতো দেখতে ফ্রাউয়েনকির্চে গির্জা। ১৯৪৫ সালে মিত্রবাহিনীর বোমাবর্ষণে ধ্বংস হয়ে যায় এই গির্জা। দীর্ঘ সময় ধ্বংসস্তূপ হয়ে থাকার পর ২০০৫ সালে এটি পুনরায় নির্মাণ করা হয়। ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে কৃত্রিম হলেও জার্মানির পুনরেকত্রীকরণ ও মানবাধিকার আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে স্থানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: সিএনএন, দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ড