মন খারাপ হলে অনেকেই ভাবেন, কেন এমন হচ্ছে তা বুঝতে পারলেই সমস্যার সমাধান হবে। তাই কী ভুল হয়েছে, কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো—এসব নিয়ে বারবার চিন্তা করেন তাঁরা। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, নেতিবাচক চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে সব সময় বেশি ভাবার প্রয়োজন নেই। বরং মন ভালো হওয়ার অপেক্ষা না করে ছোট্ট একটি কাজ শুরু করাই হতে পারে সমাধানের পথ।
মনোবিজ্ঞানে এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘বিহেভিয়রাল অ্যাকটিভেশন’ বা আচরণগত সক্রিয়তা। এর মূল কথা হলো, মন ভালো হলে কাজ করব—এমন অপেক্ষায় না থেকে বরং কাজটি শুরু করে দেওয়া। কারণ, ছোট ছোট কাজের মধ্য দিয়েই মনের অবস্থার পরিবর্তন আসতে পারে।
২০২১ সালে ‘সাইকোলজিক্যাল মেডিসিন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আচরণগত সক্রিয়তা বিষণ্নতা ও উদ্বেগের উপসর্গ কমাতে কার্যকর। এ পদ্ধতিতে কিছুক্ষণ হাঁটা, গোসল করা কিংবা কাউকে একটি বার্তার উত্তর দেওয়ার মতো সহজ কাজ করতে উৎসাহিত করা হয়। কাজগুলো এমন হতে হবে, যা মন খারাপ থাকলেও করা সম্ভব।
এ ধরনের ছোট কাজ সমস্যার সমাধান না করলেও মনোযোগ অন্যদিকে নিতে এবং নিষ্ক্রিয়তা কাটাতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, ভালো লাগার পর কাজ শুরু করার বদলে কাজ শুরু করেই ভালো লাগার সুযোগ তৈরি করা যায়।
মন খারাপের কারণ নিয়ে ভাবা স্বাভাবিক। কিন্তু একই ঘটনা, ব্যর্থতা বা কষ্টের কথা বারবার ভাবতে থাকলে তা নেতিবাচক চিন্তার চক্র তৈরি করতে পারে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘রুমিনেশন’।
২০২০ সালে ‘বিহেভিয়র রিসার্চ অ্যান্ড থেরাপি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ ধরনের চিন্তা নেতিবাচক আবেগকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে। পাশাপাশি এটি সমস্যা সমাধান এবং দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতাও কমিয়ে দেয়।
এভাবে তৈরি হয় একটি দুষ্টচক্র। মন খারাপ থাকায় মানুষ প্রয়োজনীয় কাজ এড়িয়ে যান। কাজ না করায় পরিস্থিতি আরও কঠিন মনে হয়। একসময় মনে হতে থাকে, কিছুতেই আর ভালো লাগবে না। ফলে নেতিবাচক চিন্তা আরও বাড়তে থাকে।
তবে আত্মবিশ্লেষণ সব সময় ক্ষতিকর নয়। একই বিষয় নিয়ে বারবার ভাবার পরিবর্তে সমস্যাটি কী এবং এখন কী করা যায়, তা নিয়ে বাস্তবসম্মতভাবে চিন্তা করা বেশি কার্যকর।
২০২২ সালে ‘পারসোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি রিভিউ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত দুই শতাধিক গবেষণার একটি মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরিস্থিতি থেকে মানসিকভাবে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করা এবং সমস্যা নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে ভাবা নেতিবাচক আবেগ কমাতে সাহায্য করে।
এ জন্য নিজের পরিস্থিতিকে বাইরের একজন মানুষের দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করা যেতে পারে। নিজেকেই প্রশ্ন করুন, একই সমস্যায় কোনো বন্ধু পড়লে তাঁকে কী পরামর্শ দিতেন? এতে আবেগের বশে না ভেবে পরিস্থিতি বোঝা সহজ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় সময়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নেতিবাচক চিন্তা যখন মনোযোগ সংকুচিত করে এবং কাজের আগ্রহ কমিয়ে দেয়, তখন গভীর আত্মবিশ্লেষণের চেয়ে ছোট কোনো কাজ শুরু করা সহজ হতে পারে। মন কিছুটা স্থির হলে সমস্যাটি নিয়ে গঠনমূলকভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়।
এর পেছনে রয়েছে মানুষের আবেগ, প্রেরণা ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের পারস্পরিক সম্পর্ক। মন খারাপ থাকলে মানুষ হাঁটতে বা অন্য কাজ করতে আগ্রহ হারান। আবার সেই কাজগুলো শুরু করাই মনের অবস্থার পরিবর্তনে সহায়তা করতে পারে।