কাজের ও পারিবারিক চাপ, মোবাইল-টেলিভিশনের স্ক্রিন—সব মিলিয়ে সারা দিনে আমাদের মন ও শরীর কিছু না কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকে। রাতে শোয়ার সময় অন্ধকার ঘর আর নিস্তব্ধ পরিবেশে মাথার ভেতর দুশ্চিন্তা আর অহেতুক চিন্তার ঝড় শুরু হয়। আগামীকালের কাজের চিন্তা, অতীতের কোনো ভুল বা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা মনকে তাড়া করতে থাকে। শরীর ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও মাথার ভেতর নানান চিন্তার চাকা ঘুরতে থাকে। এই অবস্থাকে বলা হয় রাতের দুশ্চিন্তা বা নাইট টাইম অ্যাংজাইটি। কখনো কি ভেবে দেখেছেন, দিনের আলো নিভে গেলে কেন দুশ্চিন্তা এত মারাত্মক হয়ে ওঠে? এটি আমাদের ঘুম ও শরীর—দুটিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই এ বিষয়ে জানা জরুরি।
দিনের তুলনায় রাতে উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা বাড়ে মূলত তিনটি কারণে।
দিনে কাজের চাপ, মানুষের সঙ্গে কথা বলা বা নানা ব্যস্ততার কারণে মন ব্যস্ত থাকে। কিন্তু রাতে কোলাহল বা কাজ না থাকায় দুশ্চিন্তাগুলো সহজে মনের দখল নিতে পারে।
রাতে আমাদের শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা কমতে শুরু করে। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় জেগে থাকার ফলে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কিছুটা কমে যায়।
নিস্তব্ধ রাতে বুকের ধুকপুকানি, পেশির টান বা দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো শারীরিক লক্ষণগুলো মানুষ খুব সহজে টের পায়। এগুলোকে বিপদ মনে করে মন আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর দ্য ট্রিটমেন্ট অ্যান্ড স্টাডি অব অ্যাংজাইটির পরিচালক এমি ব্রাউন জানান, রোগীরা প্রায়ই বলেন, সারা দিন ব্যস্ত থাকার পর রাতে ঘুমাতে গেলেই যেন তাঁদের মস্তিষ্ক হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাতের অ্যাংজাইটি ও ঘুমের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের (সেন্ট লুইস) সহকারী অধ্যাপক রেবেকা কক্স এবং অন্য গবেষকদের একটি গবেষণা ২০২৪ সালে ‘সাইকিয়াট্রি রিসার্চ’ জার্নালে প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, অ্যাংজাইটি সারা দিনের বিভিন্ন সময়ে বাড়লেও রাতে চিন্তার দৌড়াদৌড়ি সবচেয়ে বেশি হয়। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় একে ‘মাইন্ড আফটার মিডনাইট হাইপোথিসিস’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, অতীত আঘাত, জিনগত কারণ ও স্টেরয়েডের মতো ওষুধ এবং ক্যাফেইনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অ্যাংজাইটি বাড়াতে পারে।
অ্যাংজাইটি হলে শরীরে নানা লক্ষণ দেখা দেয়। যেমন হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা, ঘাম হওয়া, পেশিতে টান পড়া, মাথা ও পেটে ব্যথা বা ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া। অনেকে ঘুমের মধ্যে আতঙ্কিত হয়ে জেগে ওঠেন, যাকে নোচার্নাল প্যানিক অ্যাটাক বলা হয়। এটি ঘুমের গভীরতম ধাপ, যেমন আরইএম স্লিপ ও ডিপ স্লিপের সময় কমিয়ে দেয়। ফলে পরের দিন ক্লান্তি ও খিটখিটে মেজাজ তৈরি হয়, যা অ্যাংজাইটিকে আরও বাড়িয়ে একটি মারাত্মক ক্ষতিকর চক্র তৈরি করে।
সূত্র: হেলথলাইন, টাইমস ম্যাগাজিন, স্লিপ ফাউন্ডেশন