চুরি বিষয়টি সাধারণত গরিব মানুষের ব্যাপার মনে করা হয়। কিন্তু যে মানুষ হোটেলে এক রাত থাকতে ৫ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারে, তাকে তো আর যা-ই হোক, গরিব বলা চলে না। কিন্তু তারও কেন চুরি করার ইচ্ছা জাগে? তা-ও আবার হোটেলেরই জিনিস! বড় রহস্যময় বিষয়। এ ঘটনায় প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কোন জিনিসটি হোটেল থেকে চুরি যায় বেশি? এখানে বিষয়টি আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে। হোটেল থেকে চুরি যাওয়া জিনিসপত্রের মধ্যে প্রথমে আছে তোয়ালে বা টাওয়েল।
জার্মানিভিত্তিক ওয়েলনেস হ্যাভেনের এক সমীক্ষার ফল জানাচ্ছে, ৭৯ দশমিক ২ শতাংশ হোটেল ম্যানেজার তাঁদের হোটেল থেকে নিয়মিত তোয়ালে চুরি হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। সংখ্যাটি মনে রাখুন—প্রায় ৭৯ শতাংশ! বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ নিয়ে আরও অনেক সমীক্ষা করেছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। সেগুলোর কিছু উল্লেখ করা যাক এখানে। ভ্যাকেশন রেন্টাল প্ল্যাটফর্ম ডিলাক্স হলিডে হোমসের এক বৈশ্বিক জরিপে প্রায় ৯০ শতাংশ হোটেলকর্মী জানিয়েছেন, তাঁদের হোটেলে অবকাশ কাটাতে আসা অতিথিদের রুম থেকে তোয়ালে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা দেখেছেন তাঁরা। এ দিকে সাউদার্ন লিভিং ডট কম গত জুলাইতে তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হোটেলে চুরির কারণে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই খাতে প্রতিবছর প্রায় ১০০ মিলিয়ন বা ১০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়। এই ক্ষতির একটি বড় অংশ যায় নতুন তোয়ালে এবং বাথরোব বা গোসলের আগে অথবা পড়ে পরার জন্য ঢিলেঢালা একধরনের গাউন কিনতে।
‘ফোর্বস’ (২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) জানিয়েছে, হোটেল থেকে চুরি যাওয়া পণ্যের তালিকায় ‘সবার ওপরে ছিল তোয়ালে এবং তা-ও বিশাল ব্যবধানে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই জানিয়েছেন, অতিথিরা প্রায়শই নিজেদের ব্যাগে করে তোয়ালে নিয়ে চলে যান।’
এবার আরেকটি চমৎকার তথ্য দিই। নায়াগ্রা ইউনিভার্সিটির কলেজ অব হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট থেকে প্রকাশিত হয় ‘দ্য রুমস ক্রনিকল’ নামে হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রিবিষয়ক একটি বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সাময়িকী। এর ভলিউম ১৭, নম্বর-৪-তে ড. উইলিয়াম ডি ফ্রাই, সিএইচইর একটি লেখা প্রকাশিত হয় ‘তোয়ালে ও অন্যান্য হোটেলসামগ্রী চুরির ঘটনা থেকে হোটেলগুলো অনেক কিছু শিখতে পারে’ শিরোনামে। এখানে লেখক বলেছেন, ‘দৃশ্যত ইসরায়েলে তোয়ালে চুরি ব্যাপক—এমনকি প্রথাগতও—কারণ ধারণা করা হয়, শুধু ইসরায়েলের হোটেলগুলো থেকে প্রতিবছর ৩ থেকে ৪ লাখ তোয়ালে নিয়ে যাওয়া হয়।’ এই থেকে অনুমান করা হয়, হোটেল থেকে তোয়ালে চুরিতে ইসরায়েলিরা পৃথিবীতে সেরা!
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন? হোটেল থেকে তোয়ালে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার এই ইচ্ছা হয় কেন মানুষের? এর পেছনে বেশ কিছু মজার মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে বলে অনুমান করা হয়। ফলে বিষয়টি শুধু ‘চুরি করার ইচ্ছা’ হিসেবে দেখলে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত আছে। বিষয়টিকে অনেক গবেষকই মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখেছেন। চলুন, দেখে নেওয়া যাক, কেন মানুষের মধ্যে হোটেলের তোয়ালে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা জাগে।
‘হোটেল ফিল’ ঘরে নিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা
হোটেলের নরম, মোটা, সাদা তোয়ালে অনেকের কাছে বিলাসিতা ও আরামের প্রতীক। বাড়িতে একই ধরনের তোয়ালে থাকলেও হোটেলের তোয়ালেটি ব্যবহার করলে ভ্রমণের স্মৃতি ফিরে আসতে পারে। তাই এটি হয়ে ওঠে একধরনের স্মারক বা স্যুভেনির।
সাইকোলজিক্যাল ওনারশিপ
হোটেলের ঘরে রাখা জিনিসগুলো অতিথির ব্যবহারের জন্যই দেওয়া হয়। ফলে কিছু মানুষের মনে সাময়িকভাবে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে—জিনিসটি যেন তাদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্যই। এখান থেকেই মালিকানাবোধের মতো একটি অনুভূতি তৈরি হতে পারে। অনেক গবেষক মনোবিজ্ঞানের ‘সাইকোলজিক্যাল ওনারশিপ’ ধারণা দিয়ে হোটেলে অতিথিদের তোয়ালে নিয়ে যাওয়ার মতো আচরণের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
মান ভালো মনে হওয়া
হোটেলগুলো সাধারণত এমন তোয়ালে বেছে নেয়, যেগুলো মোটা, শোষণক্ষম এবং দেখতে ঝকঝকে। বাড়ির পুরোনো বা পাতলা তোয়ালের সঙ্গে তুলনা করলে সেটি বেশ আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। ফলে ‘এমন একটা বাড়িতে থাকলে মন্দ কী’ জাতীয় ধারণা তৈরি হয়।
ভ্রমণ-স্মৃতি ধরে রাখার প্রবণতা
ভ্রমণ শেষে মানুষ প্রায়ই কোনো বস্তু সঙ্গে নিয়ে ফিরতে চায়—ম্যাগনেট, পোস্টকার্ড, ছোট বোতল, মেনু কিংবা অন্য কোনো স্মারক। হিউ উইলকিন্স নামের এক গবেষক স্যুভেনিরকে ভ্রমণ অভিজ্ঞতার একটি বস্তুগত স্মারক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি মনে করেন, বিশেষ মুহূর্ত মনে রাখার জন্য মানুষ এসব বস্তু সংগ্রহ করে।
তোয়ালে তুলনামূলকভাবে বড় হলেও এটি নরম, ব্যবহার উপযোগী এবং দীর্ঘদিন টিকে থাকে। তাই কারও কাছে এটি ভ্রমণের স্মৃতি ধরে রাখার বস্তু হয়ে উঠতে পারে।
নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষণ
আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয় হলো রিয়্যাকট্যান্স। কোনো কিছু নিষিদ্ধ বা সীমাবদ্ধ মনে হলে সেটির প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেড়ে যেতে পারে। হোটেলের কোনো জিনিস ‘নিয়ে যাওয়া যাবে কি না’—এই অনিশ্চয়তাও কারও কৌতূহল বাড়াতে পারে। তবে হোটেলের তোয়ালে নেওয়া সাধারণত হোটেলের সম্পত্তি নেওয়ার মধ্যেই পড়ে, যদি না হোটেল স্পষ্টভাবে তা অনুমতি দেয়।
খানিক অনভিজ্ঞতা
কেউ কেউ হোটেল রুমের ভাড়া দেওয়াকে সেখানে থাকা জিনিসগুলোর ওপরও একধরনের অধিকার হিসেবে ভাবতে পারেন। কিন্তু হোটেলের ভাড়া মূলত সেবা ও থাকার সুযোগের মূল্য, ঘরের স্থায়ী জিনিসপত্রের মালিকানা নয়; বিশেষ করে মানুষ হোটেলে থাকা শুরুর দিকে এ ধরনের ঘটনা ঘটায় বেশি। এটি মূলত অনভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত।
হোটেলের ‘চলে যেতে পারে’ এমন জিনিসের মধ্যে তোয়ালে ও বাথরোব নিয়ে আলোচনা বেশি হয়। কারণ, এগুলো একই সঙ্গে ব্যবহার উপযোগী, তুলনামূলক দামি এবং বিলাসিতার অনুভূতি তৈরি করে। তবে হোটেলভেদে নিয়ম আলাদা। অনেক হোটেল তোয়ালে নিয়ে গেলে চার্জ করে, আবার কিছু হোটেল তোয়ালে বা বাথরোব বিক্রির ব্যবস্থাও রাখে।
তবে এটি ঠিক, কারণ যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতি হয় হোটেল বা রিসোর্টগুলো। তথ্যটি তো ইতিমধ্যে জেনে গেছেন যে শুধু আমেরিকায় প্রতিবছর হোটেলগুলো প্রায় ১০০ মিলিয়ন বা ১০ কোটি ডলার ক্ষতি মুখোমুখি হয় শুধু তোয়ালে, বাথরোব বা এ রকম ছোট ছোট জিনিস চুরির জন্য। তবে হ্যাঁ, এরপর যদি কোনো হোটেলের তোয়ালে খুব পছন্দ হয়ে যায়, তাহলে সরাসরি কিনে নিন। তাতে হোটেলগুলোর ক্ষতিও হয় না, আর আপনিও মানসিক অশান্তি থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন।
সূত্র: এবিজিসেজ ডট কম, সাউদার্ন লিভিং ডট কম, হসপিটালিটি লইয়ার ডট কম, ট্রাভেল অ্যান্ড লিজার ডট কম, ওয়েলনেস হ্যাভেন ডট ডিই