হোম > জীবনধারা > ফিচার

৯০ দশকের মোহ কেন আমাদের কাটছে না

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

১৯৯৪ সালে ইংল্যান্ডে আয়োজিত এক ‘রেভ’ পার্টিতে মাঝখানে ভিনকা পিটারসেন। ছবি: সিএনএন

কখনো কখনো মনে হয়, আমরা যেন হঠাৎ করেই ফিরে গেছি নব্বইয়ের দশকে। কার্গো প্যান্ট, স্লিপ ড্রেস, মিনিমালিস্ট ফ্যাশন, কেট মসের পুরোনো স্টাইল—সবকিছুই আবার ফিরে আসছে। ওসিস আবার কনসার্ট করছে, পুরোনো গান নতুন করে জনপ্রিয় হচ্ছে। অথচ সময়টা এখন ২০২৬। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর অ্যালগরিদম-নির্ভর জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেন আমরা বারবার ফিরে তাকাচ্ছি সেই দশকের দিকে?

কারণটি সম্ভবত, নব্বইয়ের দশক ছিল প্রযুক্তি ও বাস্তব জীবনের মাঝামাঝি এক অদ্ভুত ভারসাম্যের সময়। তখনো ইন্টারনেট ছিল, কিন্তু এটি তখন আমাদের জন্য অপরিহার্য কিছু ছিল না। মোবাইল ফোনও ছিল, কিন্তু এটির ধারে কাছেও ছিল না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। মানুষ তখন অনলাইনে থাকার চেয়ে বাইরে থাকার জন্য বেশি সময় পেত।

বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে নব্বইয়ের দশক ছিল সাদামাটা অথচ বিদ্রোহী এক সৃজনশীলতার সময়। আশির দশকের চাকচিক্য ও ভোগবাদকে পেছনে ফেলে তরুণেরা তৈরি করেছিল নতুন এক সংস্কৃতি। ইন্ডি ম্যাগাজিন, হিপহপ, রেভ সংস্কৃতি এবং তরুণ শিল্পীদের কাজ তৈরি করেছিল এক ভিন্ন নান্দনিকতা। সেই সময়ের শিল্প ও ফ্যাশনকে কেন্দ্র করেই লন্ডনের টেট ব্রিটেনে আয়োজন করা হয়েছে এক প্রদর্শনী। শতাধিক ছবি, ভাস্কর্য ও পোশাকের মাধ্যমে সেখানে তুলে ধরা হয়েছে নব্বইয়ের সেই সৃজনশীল উন্মাদনা।

প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ ভিনকা পিটারসেনের কাজ। তাঁর ছবিতে ধরা পড়েছে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের আন্ডারগ্রাউন্ড রেভ সংস্কৃতি—নিজেদের তৈরি সাউন্ড সিস্টেম, পরিত্যক্ত গুদামঘরে রাতভর নাচ, ভোরের ক্লান্তি এবং বন্ধুত্ব। তখনকার তরুণদের কাছে সংস্কৃতি মানে ছিল অংশ নেওয়া, দর্শক হয়ে থাকা নয়।

ফটোগ্রাফার ইউর্গেন টেলারও নব্বইয়ের দশকের সেই স্বতঃস্ফূর্ততার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। কিশোরী কেট মস-সহ অসংখ্য তরুণ মডেলের অপ্রস্তুত, অসম্পূর্ণ, কখনো অস্বস্তিকর মুহূর্ত তিনি ক্যামেরায় ধরেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে নতুন মুখ ও বৈচিত্র্যকে সামনে আনা।

১৯৯৮ সালে লন্ডনে নিজের বাড়িতে ইউর্গেন টেলার কর্তৃক ক্যামেরাবন্দী হন মডেল কেট মস

ফটোগ্রাফার ও ডিজে নর্মস্কির স্মৃতিতেও সেই সময়টি আলাদা। লন্ডনের ঘামভেজা ডান্সফ্লোর, ব্রিটিশ হিপহপের উত্থান, পাবলিক এনেমি বা উ-ট্যাং ক্ল্যানের মতো মার্কিন শিল্পীদের প্রভাব—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক প্রাণবন্ত সংস্কৃতি। তাঁর মতে, তখনকার ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ সত্যিই আন্ডারগ্রাউন্ড ছিল। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই সবকিছু প্রকাশ হয়ে যেত না।

লন্ডনের ‘জাঙ্গল’ (Jungle) মিউজিক ধারার ব্যাপক উত্থানের বিষয়টিও ডিজে নর্মস্কির ‘ম্যান উইথ দ্য গোল্ডেন শাটার’ বইটিতে উঠে এসেছে।

আজকের তরুণদের নব্বইয়ের প্রতি আকর্ষণের পেছনে তাই শুধু পোশাক বা গান নয়, আছে এক ধরনের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও। মনোবিজ্ঞানী ক্লে রাউটলেজের মতে, এটি প্রযুক্তিবিরোধিতা নয়; বরং প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটি কীভাবে আরও অর্থপূর্ণ করা যায়, সেই প্রশ্ন।

নব্বইয়ের দশকে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে হয়তো একটি কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগ ছিল। সেটি ছিল প্রয়োজনের সময় ব্যবহারের জিনিস, সারাক্ষণের সঙ্গী নয়। প্রযুক্তি তখন মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার বদলে সৃজনশীলতার নতুন দরজা খুলেছিল। ঘরে বসে সংগীত তৈরি করা, ই-মেইলে দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, নতুন ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া—সবকিছুই সম্ভব হচ্ছিল। কিন্তু মানুষ তখনো বাস্তব জগতের জায়গা হারায়নি।

লন্ডনের পরিত্যক্ত শিল্প-গুদামগুলো হয়ে উঠেছিল শিল্পী ও সংগীতপ্রেমীদের আড্ডা। শিল্পীরা প্রচলিত গ্যালারির বাইরে কাজ করার জায়গা পেয়েছিলেন। তরুণেরা তৈরি করেছিল নিজেদের সংস্কৃতি। ভিনকা পিটারসেনের মতে, লন্ডনের স্কোয়াটে থাকা মানুষদের ভাড়া নিয়ে কম ভাবতে হতো বলে তারা বেশি সময় পেত। আর সময় মানেই ছিল সৃজনশীলতার সুযোগ।

তবে নব্বইয়ের দশককে পুরোপুরি আদর্শ সময় ভাবারও সুযোগ নেই। ‘হেরোইন চিক’ ফ্যাশন, বর্ণবৈষম্য, যৌনতা ও পরিচয় নিয়ে সংকীর্ণতা—সবই ছিল। তৎকালীন ফ্যাশনজগতের ক্ষমতার কাঠামোও ছিল অনেক বেশি কেন্দ্রীভূত। কৃষ্ণাঙ্গ মডেল ও শিল্পীদের জায়গা করে নিতে লড়াই করতে হয়েছে।

তাহলে আমরা কেন বারবার সেই দশকে ফিরছি?

কারণ সম্ভবত বর্তমানের দ্রুতগতির পৃথিবীতে আমরা অতীত থেকে ভবিষ্যতের কিছু উত্তর খুঁজছি। ফ্যাশনে যখন নতুন ধারণার সংকট তৈরি হয়, তখন পুরোনো নকশা ফিরে আসে। সংস্কৃতিতেও তাই। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের প্রতি আকর্ষণ শুধু পুরোনো পোশাক বা গানের প্রতি নস্টালজিয়া নয়; এটি হয়তো এমন এক জীবনের প্রতি আকাঙ্ক্ষা, যেখানে প্রযুক্তি ছিল—কিন্তু প্রযুক্তি আমাদের পুরো জীবন হয়ে ওঠেনি।

আজকের তরুণেরা হয়তো নব্বইয়ের দশককে স্মরণ করছে না; তারা সেটিকে নতুন করে আবিষ্কার করছে। অতীত থেকে তারা খুঁজে নিচ্ছে এমন কিছু ধারণা, যা ভবিষ্যৎকে আরও মানবিক করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত নব্বইয়ের দশকের আসল আকর্ষণ হয়তো তার ফ্যাশন, গান কিংবা সিনেমায় নয়। আকর্ষণটি ছিল সময় পাওয়ায়, বাস্তব মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগে, নিজের মতো করে কিছু তৈরি করার স্বাধীনতায় এবং সবকিছু প্রকাশ না করেও বেঁচে থাকার ক্ষমতায়।

আর হয়তো সে কারণেই ২০২৬ সালেও আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই নব্বইয়ের দশকে ফিরতে চাই, নাকি নব্বইয়ের সেই স্বাধীনতাটুকু নিজেদের বর্তমান জীবনে ফিরিয়ে আনতে চাই?

সিএনএন অবলম্বনে