চীনের একটি স্কুলে সকাল শুরু হয় পরিচিত এক দৃশ্য দিয়ে। স্কুল গেটের সামনে সাদা গ্লাভস আর ট্রাফিক জ্যাকেট পরা একজন মানুষ হাতের ইশারায় গাড়ি থামাচ্ছেন এবং শিশুদের রাস্তা পার হতে বলছেন। দূর থেকে দেখলে তাঁকে ট্রাফিক পুলিশ মনে হবে। খুব কম মানুষই জানেন, তিনি আসলে স্কুলটির উপপ্রধান শিক্ষক।
এই মানুষটির নাম উ বিন। বয়স ৬০। চীনের হাংঝৌ শহরের হাংঝৌ ১৪ নম্বর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উপপ্রধান শিক্ষক তিনি। টানা ৩৪ বছর ধরে, প্রতিদিন সকালে প্রায় ১ ঘণ্টা সময় স্কুল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে রাস্তা পার হতে সাহায্য করছেন তিনি।
দায়িত্ব শুরু করেন ভোর থেকে
স্কুলটি লংতেং রোডের পাশে অবস্থিত। আট লেনের ব্যস্ত একটি সড়ক এটি। এখানে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থী স্কুলে আসে। নিয়ম মেনে সে সময়েই যান চলাচল সবচেয়ে বেশি। এই ব্যস্ত সময়ের জন্য উ বিন আসেন আরও আগে। সকাল ৬টা ১০ মিনিটে তিনি স্কুলে পৌঁছান। নাশতা সেরে গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। বৃষ্টির দিন হলে পুরো নিরাপত্তা টিমের জন্য ছাতা, বুট আর জ্যাকেটের ব্যবস্থা করে রাখেন তিনি নিজেই। ১ ঘণ্টার দায়িত্বে থাকাকালে ফোনে চোখ দেওয়া তো দূরের কথা, ফোন ছোঁয়াও নিষেধ। উ বিন বলেন, ‘এক সেকেন্ডের অসতর্কতাও দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। সেটা অভিভাবকদের প্রতি দায়িত্বহীনতা।’
সবাই তাঁকে চেনে অন্যভাবে
প্রতিফলক জ্যাকেট আর সাদা গ্লাভসে তাঁকে দেখে কেউ বুঝতেই পারে না এ মানুষটিই স্কুলের উপপ্রধান শিক্ষক। তিনি প্রতিটি লেন গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখেন, ঠিক সময়ে গাড়ি থামান, আবার দ্রুত শিক্ষার্থীদের পার করে দেন। শীতকালে দায়িত্ব আরও কঠিন হয়ে যায়। কুয়াশার কারণে আশপাশে কম দেখা যায়। আবার গাড়ির সংখ্যাও বেড়ে যায়। তখন উ বিন আরও সতর্ক থাকেন। তাঁর ভয়, কোনো গাড়ি যেন অজান্তেই তাঁর চোখের আড়ালে চলে না যায়।
শিক্ষক পরিচয়ের বাড়তি দায়িত্ব
শুধু ট্রাফিক সামলানোই নয়, ছোটখাটো ঝামেলা হলে তিনিই হয়ে ওঠেন ‘মধ্যস্থতাকারী’। অনেক অভিভাবকই তাঁর সাবেক শিক্ষার্থী। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘আমি সামনে এলে সবাই শান্ত হয়ে যায়। কেউ আর তর্ক করতে চায় না।’
যেভাবে শুরু হয়েছিল
এই অভ্যাসের শুরু ১৯৯১ সালে। তখন উ বিনের বয়স মাত্র ২৭। শুরুতে তিনি চেয়েছিলেন, সকালবেলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের মুখ আর নাম চিনে নিতে। কিন্তু চাকরির বদলি, সময়ের পরিবর্তন—সব পেরিয়ে স্কুল গেটে দাঁড়ানোই তাঁর জীবনের অংশ হয়ে যায়। কিছু বছর তাঁকে ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে বাড়ি ছাড়তে হয়েছে। কুয়াশায় ঢাকা শহর পেরিয়ে স্কুলে পৌঁছাতে হয়েছে শুধু সময়মতো দায়িত্ব পালনের জন্য।
৩৪ বছরে একটিও দুর্ঘটনা নয়
এ দীর্ঘ সময়ের সবচেয়ে বড় অর্জন, এ সময় একজন শিক্ষার্থীরও দুর্ঘটনা ঘটেনি। উ বিন বলেন, ‘আমি আসলে ভয় থেকেই এ কাজ করে গেছি। শিশুরা কয়েক সেকেন্ডে রাস্তা পার হয়। কিন্তু যদি কিছু ঘটে যায়, সেটা একটি পরিবারের আজীবনের ট্র্যাজেডি হয়ে যায়।’
মেরুদণ্ড ও কোমরের ব্যথা
এ গল্প ছড়িয়ে পড়ার পর অনেক অভিভাবক পার্কিংয়ের ব্যাপারে সচেতন হয়েছেন। তরুণ শিক্ষক-কর্মীরাও স্বেচ্ছায় তাঁর দলে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু খুব কম মানুষ জানেন, উ বিন ভুগছেন অ্যাঙ্কাইলোজিং স্পন্ডাইলাইটিসে। দীর্ঘদিনের পিঠব্যথার কারণে মেরুদণ্ড ও কোমরের জয়েন্টে এ প্রদাহ হয়েছে তাঁর।
এমন একজন শিক্ষক আমাদের মনে করিয়ে দেন, দায়িত্ববোধ কতটা শক্তিশালী হতে পারে। ৩৪ বছর ধরে প্রতিদিন ভোরে স্কুল গেটে উ বিন দাঁড়াতেন আসলে অসংখ্য শিশুর জীবনের নিরাপত্তার জন্য। শারীরিক কষ্ট, ব্যক্তিগত ত্যাগ আর অপূর্ণতা সত্ত্বেও তিনি দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। হাজারো সন্তানের নিরাপদ স্কুলজীবনে অবদান রাখায় তাঁকে এক নীরব নায়কে পরিণত করেছে।
সূত্র: হাংঝৌ ডেইলি