আর্কটিক সার্কেলে পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম স্থানে তিন মাস কাটিয়েছেন ভ্রমণলেখক পিটার জন ওয়াটসন। সেখানে পেঙ্গুইনদের জীবন পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে ভালোবাসা, সম্পর্ক ও জীবনের অর্থ সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি পেয়েছেন তিনি। তাঁর অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে, ভালোবাসা সব সময় বড় কোনো ঘোষণা কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের বিষয় নয়; বরং ছোট ছোট যত্ন, ধৈর্য ও দায়িত্ববোধের মধ্যেই এর প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে।
ওয়াটসনের ‘কাউন্টিং পেঙ্গুইন’ বই থেকে জানা যায়, দুই বছর আগে অ্যান্টার্কটিক সার্কেলের প্রায় ২০০ মাইল উত্তরে অবস্থিত গৌডিয়ার দ্বীপে গিয়েছিলেন তিনি। ট্রাফালগার স্কয়ারের আয়তনের কাছাকাছি এই পাথুরে দ্বীপটির নিকটতম শহরও প্রায় ৭০০ মাইল দূরে। সেখানে ওয়াটসনের দায়িত্ব ছিল ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের হয়ে জেন্টু পেঙ্গুইন গণনা করা।
দ্বীপে পৌঁছে প্রথমেই পেঙ্গুইনদের তীব্র কোলাহলে মুগ্ধ হন তিনি। কমলা ঠোঁট, গোলাপি পা ও মাথায় সাদা পালকের ছোঁয়ায় পাখিগুলো দেখতে অনেকটা ছোট শিশুর মতো। স্থলে তাদের চলাফেরা বেশ হাস্যকর হলেও পানির নিচে তারা অসাধারণ দক্ষ। ঘণ্টায় দ্রুতগতিতে সাঁতার কাটতে সক্ষম এই পাখিরা প্রায় ৬৫০ ফুট গভীরতায় ডুব দিতে পারে।
বড়দিনের ঠিক আগে দ্বীপে পৌঁছানোয় পেঙ্গুইনদের প্রজননকালীন এক বিশেষ আচরণ দেখার সুযোগ পান ওয়াটসন। সঙ্গীকে আকৃষ্ট করতে পুরুষ পেঙ্গুইন বেছে নেয় একটি মসৃণ নুড়িপাথর। সেটি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে স্ত্রী পেঙ্গুইনকে উপহার দেয়। এভাবে একের পর এক পাথর সংগ্রহ করে তারা বাসা তৈরি করে, যাতে তাদের ডিমগুলো শুকনো ও উষ্ণ থাকে।
অ্যান্টার্কটিকায় যাওয়ার কিছুদিন আগে নতুন একটি সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন ওয়াটসন। ফলে পেঙ্গুইনদের এই আচরণে তিনি ভালোবাসার এক অনন্য প্রতিচ্ছবি দেখতে পান। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি তাঁর বইয়ে লিখেছেন—‘বড় কোনো ঘোষণা নয়, জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনীও নয়। শুধু ছোট ছোট যত্নের ধারাবাহিক সঞ্চয়।’ তাঁর মতে, ভালোবাসা হয়তো ঠিক এমনই হওয়া উচিত।
পরে পেঙ্গুইনছানার সংখ্যা গণনা করতে গিয়ে দ্বীপের সবচেয়ে বদমেজাজি পেঙ্গুইন অ্যাগির সঙ্গে পরিচয় হয় ওয়াটসনের। মানুষকে একেবারেই সহ্য করতে না পারা অ্যাগি সুযোগ পেলেই হাঁটুর পেছনে ভয়ংকর ঠোকর বসিয়ে দিত।
তবে এই দ্বীপের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায় ছিল পেঙ্গুইন ছানাদের বেঁচে থাকার লড়াই। বাসা ছেড়ে যাওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় গণনা করে দেখা যায়, প্রথমবারের গণনায় থাকা প্রায় এক-চতুর্থাংশ ছানা মারা গেছে। কেউ শিকারির আক্রমণে, কেউবা পাহাড়ের খাড়া ঢাল থেকে পড়ে। বেঁচে থাকা ছানাদের প্রতি মমতা অনুভব করার পাশাপাশি মৃতদের হারানোর বেদনাও গভীরভাবে অনুভব করেন ওয়াটসন। তিনি লেখেন, ‘ওরা ছিল আমার ছানা।’
দুর্গম দ্বীপের অভিজ্ঞতা ওয়াটসনের জীবনদর্শনও বদলে দেয়। আগে তিনি সব সময় নতুন অভিযানের সন্ধানে থাকতেন। কিন্তু পেঙ্গুইনদের কাছ থেকে শিখেছেন, জীবনের প্রাপ্তি উপলব্ধি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়াটসন বলেন, ‘ইংল্যান্ডে ফিরে আমার যা কিছু প্রয়োজন, সবই অপেক্ষা করছিল। শুধু নতুন কিছুর পেছনে ছোটা বন্ধ করে আগে থেকেই যা আছে, তা উপলব্ধি করার জন্য একটু সময় বের করতে হতো।’
পেঙ্গুইনদের জীবন তাই ভালোবাসার পাশাপাশি মনে করিয়ে দেয়—সুখ সব সময় নতুন কিছু অর্জনের মধ্যে নয়; বরং কাছের মানুষ, ছোট ছোট যত্ন এবং ইতিমধ্যে পাওয়া সম্পর্কগুলোর মূল্য বুঝতে শেখার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।