হোম > জীবনধারা > জেনে নিন

আপনি কি অটো পাইলট মোডে চলে গেছেন? জেনে নিন বের হওয়ার উপায়

ফিচার ডেস্ক  

মানুষের মন ৩০-৫০ শতাংশ সময় অন্য চিন্তায় ভাসতে থাকে। এমন অবস্থা আমাদের জীবন থেকে আনন্দের মুহূর্তগুলো কেড়ে নেয়। ছবি: পেক্সেলস

প্রতিদিনের ব্যস্ততায় হঠাৎ মনে হতে পারে মাসের পর মাস কেটে যাচ্ছে, কিন্তু জীবনের দিনগুলো যেন স্মৃতিহীন একটি ঝাপসা ক্যানভাস। সকালে গাড়ি বা বাইক চালিয়ে কর্মস্থলে যাওয়া, দুপুরের খাবার খাওয়া বা রাতের আড্ডা। কোনো কিছুই যেন স্পষ্টভাবে মনে নেই। জীবন যখন কোনো বিশেষ অনুভূতি ছাড়া কেবল অভ্যাসের বশে চলতে থাকে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় অটো পাইলট বা সচেতনতাহীন মানসিক অবস্থা। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মন ৩০-৫০ শতাংশ সময় অন্য চিন্তায় ভাসতে থাকে। আর এমন অবস্থা আমাদের জীবন থেকে আনন্দের মুহূর্তগুলো কেড়ে নেয়।

অটো পাইলট জীবনের প্রধান কিছু লক্ষণ

মানসিক অনুপস্থিতি ও স্মৃতির ঝাপসা ভাব: সারা দিন কী কাজ করা হলো, সকালে বা রাতে কী খাওয়া হলো অথবা কার সঙ্গে কী কথা হলো, তা মনে রাখতে না পারা। গাড়ি চালানো, খাওয়া বা দৈনন্দিন কাজগুলো সচেতন মন ছাড়া অভ্যাসের বশে যান্ত্রিকভাবে করে যাওয়া।

সময় ও দিন হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি: একটি দিনের সঙ্গে অন্য দিনের কোনো পার্থক্য খুঁজে না পাওয়া। সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হওয়া বা সপ্তাহ পার হয়ে নতুন সপ্তাহ চলে আসার ঘটনাগুলোকে ব্লার বা ঝাপসা মনে হওয়া।

চিন্তায় ডুবে থাকা ও মনোযোগের অভাব: বর্তমান মুহূর্তে উপস্থিত না থেকে মন সব সময় অন্য কোনো চিন্তায় ভাসতে থাকা। যেকোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে কষ্ট হওয়া এবং খুব সহজেই বিচলিত হয়ে পড়া।

নিষ্ফল কাজ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় ব্যয়: সারা দিনে কোনো অর্থপূর্ণ অগ্রগতি না হওয়া সত্ত্বেও অবচেতনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করে সময় নষ্ট করা।

সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসমর্থ ও অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি: ‘না’ বলতে না পারার কারণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেকোনো দাওয়াত বা অতিরিক্ত কাজের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে তা নিয়ে আফসোস বা দুশ্চিন্তা করা।

ছোটখাটো বিষয়ে বিরক্তি ও মেজাজ খিটখিটে হওয়া: প্রতিদিনের রুটিনে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলে বা ছোটখাটো বিলম্ব হলে অতিরিক্ত রাগ ও বিরক্তি প্রকাশ পাওয়া।

আবেগহীনতা ও ক্রমাগত ক্লান্তি অনুভব করা: নিজের অনুভূতিগুলোর সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হওয়া এবং জীবনের আনন্দ বা দুঃখ গভীরভাবে অনুভব করতে না পারা। সব সময় একধরনের মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি কাজ করা।

জীবনের প্রতি অসন্তোষ ও স্থবিরতা: প্রতিদিনের কাজ বা ক্যারিয়ার নিয়ে ভেতরে অনীহা থাকা সত্ত্বেও পরিচিত গণ্ডি বা কমফোর্ট জোন ছেড়ে বের হতে না পারা। ভবিষ্যতের জন্য কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা বা লক্ষ্য না থাকা এবং কেবল বেঁচে থাকার জন্য বেঁচে থাকা, উপভোগ না করা।

নিষ্ফল স্ক্রলিংয়ের বদলে বই পড়া, পডকাস্ট শোনা বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের পেছনে সময় বিনিয়োগ করা বেশি ফলপ্রসূ। ছবি: পেক্সেলস

কাজের পেছনে ব্যক্তিগত জীবন বিসর্জন দেওয়া: কাজকেই জীবনের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে ফেলা। দুপুরের খাবার, রাতের খাবার বা ছুটির সময়ের আনন্দ বাদ দিয়ে কেবল কাজ করে যাওয়া এবং প্রিয়জনদের সময় না দেওয়া।

সচেতন জীবনে ফেরার কৌশল

আত্ম প্রতিফলন ও মাইন্ডফুলনেস: প্রতিদিন সকালে মাত্র পাঁচ মিনিট একটি ইতিবাচক সংকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন আজ আমি প্রতিটি কাজে মনোযোগ দেব। রাতে ঘুমানোর আগে সারা দিনের কাজের মূল্যায়ন মনকে শান্ত রাখে। গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া বা ধ্যানের অভ্যাস সচেতনতা ফেরাতে সাহায্য করে।

ক্ষুদ্র অভ্যাস চর্চা: জীবন রাতারাতি বদলে ফেলা যায় না। তাই ছোট পদক্ষেপ থেকে শুরু করা উচিত। যেমন শরীরচর্চা শুরু করার জন্য আগের রাতে ব্যায়ামের পোশাক গুছিয়ে রাখা। ৮০/২০ নিয়ম মেনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে আগে মনোযোগ দেওয়া ভালো।

চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া: নেতিবাচক চিন্তা বা কোনো নিরাপত্তাহীনতাকে সুযোগ হিসেবে রিফ্রেম বা পরিবর্তন করে ভাবা শিখতে হবে। যেকোনো জটিল পরিস্থিতি নিজেকে উন্নত করার একেকটি উপায় হিসেবে দেখলে মানসিক চাপ কমে।

সোশ্যাল মিডিয়া ও সময়ের সচেতন ব্যবহার: সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর অন্তত প্রথম এক ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকা নিশ্চিত করতে হবে। নিষ্ফল স্ক্রলিংয়ের বদলে বই পড়া, পডকাস্ট শোনা বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের পেছনে সময় বিনিয়োগ করা বেশি ফলপ্রসূ।

নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি ও সম্পর্কে বিনিয়োগ: ছকবাঁধা রুটিন ভেঙে নতুন কিছু চেষ্টা করতে হবে, যা আপনাকে আপনার আরামদায়ক পরিবেশ থেকে বের করে আনবে। কাছের মানুষ, পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত ও সচেতনভাবে সময় কাটানো জীবনের ক্লান্তি দূর করতে বড় ভূমিকা রাখে।

নিখুঁত হওয়ার প্রবণতা ত্যাগ: সবকিছু একদম নিখুঁত হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে ছোট লক্ষ্য সেট করে কাজ শুরু করে দেওয়া জরুরি। প্রতিদিনের ছোট সফলতাগুলো উদ্‌যাপন করলে জীবন আবার স্বতঃস্ফূর্ত ও অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে।

জীবন কেবল পার করে দেওয়ার জন্য নয়, প্রতিটি মুহূর্তকে অনুভব করার জন্য। ছোট ছোট সচেতন পদক্ষেপই অটো পাইলট জীবন থেকে মুক্ত করে একটি সুন্দর ও সফল জীবন উপহার দিতে পারে।

সূত্র: মিডিয়াম, সাকসেস ম্যাগাজিন, স্টাইলিস্ট