ব্যস্ত দিনের মাঝে আমরা অনেক সময় এক কাপ চা বা কফি হাতে নিয়ে একটু বসতে চাই। কিন্তু সেই ‘একটু বসা’ কখনো হয়ে ওঠে মানুষের সঙ্গে কথা বলার, হাসি ভাগ করে নেওয়ার কিংবা দিনের ক্লান্তি একটু দূরে সরিয়ে রাখার একটি সুবর্ণ সুযোগ। সুইডেনে এমন বিরতিকেই দেওয়া হয়েছে বিশেষ এক নাম—ফিকা। সেখানে কফি খাওয়ার এই মুহূর্ত শুধু কফি খাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ব্যস্ততার মধ্যেও থেমে গিয়ে অন্য মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর একটি সামাজিক রীতি।
ফিকা সুইডিশ জীবনের বেশ পরিচিত একটি অংশ। শব্দটি বিশেষ্য ও ক্রিয়া—দুভাবেই ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ কেউ ফিকা করতে যেতে পারেন, আবার কারও সঙ্গে ফিকার আয়োজনও করতে পারেন। সাধারণত এক কাপ কফির সঙ্গে থাকে কোনো মিষ্টি খাবার। তবে ফিকার মূল আকর্ষণ খাবার নয়, বরং পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো।
ফিকার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। দিনের যেকোনো সময় এটি হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে ফিকার জন্য আলাদা বিরতি রাখা হয়। অনেক সুইডিশ কর্মস্থলে দিনে দুবার—সকালে ও বিকেলে ফিকার বিরতি নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এই সময়কে তাড়াহুড়া করে শেষ করার বিষয় হিসেবে দেখা হয় না। বরং কাজ থেকে সাময়িকভাবে মন সরিয়ে সহকর্মী, বন্ধু কিংবা পরিবারের সঙ্গে কথা বলা এবং মুহূর্তটিকে উপভোগ করাই ফিকার মূল উদ্দেশ্য। বাসা, ক্যাফে, কর্মক্ষেত্র এমনকি প্রকৃতির মাঝেও ফিকা করা যায়।
এক কাপ কফির সঙ্গে মিষ্টি খাবার ফিকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এর মধ্যে জনপ্রিয় হলো কানেলবুলার। এটি দারুচিনি, চিনি ও মাখন দিয়ে তৈরি সুগন্ধি দারুচিনি রোল। সুইডেনের ক্যাফে ও বেকারিগুলোতে এই খাবার বেশ পরিচিত। এ ছাড়া রয়েছে প্রিন্সেস কেক, চকলেট বল, ক্লাদকাশা নামের নরম ও আর্দ্র চকলেট কেক এবং ছোট কুকিজ। সুইডিশ বেকিং সংস্কৃতিতে সেভেন টাইপস অব কুকিজ বা সাত ধরনের কুকিজেরও দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।
ফিকার জন্য কঠোর কোনো নিয়ম নেই। তবে এর মূল ভাবনাটি হলো তাড়াহুড়া না করা। কফি বা পছন্দের কোনো পানীয় নিয়ে আরাম করে বসতে পারেন। সঙ্গে রাখতে পারেন কেক, কুকিজ বা দারুচিনি রোল। কারও বাড়িতে ফিকার আমন্ত্রণ পেলে সঙ্গে কেক বা পেস্ট্রি নিয়ে যাওয়ার রীতি রয়েছে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উপস্থিত থাকা। অর্থাৎ ফোনে ব্যস্ত না থেকে মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং সময়টিকে উপভোগ করা।
ফিকার ইতিহাসও বেশ আকর্ষণীয়। ফিকা শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে ধারণা করা হয়, পুরোনো সুইডিশ শব্দ কাফি, যার অর্থ কফি। এর অক্ষর বা শব্দাংশ উল্টে তৈরি হয়েছে ফিকা শব্দটি। সুইডেনে ১৮ শতকে কফির প্রচলন শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে এর সঙ্গে বিভিন্ন বেকারি খাবার যুক্ত হয়। ১৯ শতকে প্যাটিসেরির বিস্তারের সঙ্গে কফি ও মিষ্টি খাবারকে ঘিরে সামাজিক আড্ডার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ তাই ফিকা কেবল এক কাপ কফি খাওয়ার নাম নয়। এটি কাজের মাঝে বিরতি নেওয়া, প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলা এবং জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত উপভোগ করার একটি সামাজিক সংস্কৃতি।
সূত্র: ভিজিট সুইডেন