হোম > জীবনধারা > জেনে নিন

কল্পনায় ডুবে আছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা? বিপদে পড়ার আগে জেনে নিন প্রতিকার

ফিচার ডেস্ক

ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় বসে বা শুয়ে কল্পনায় ডুবে থাকার ফলে শারীরিক সক্রিয়তা একদম কমে যায়। ছবি: পেক্সেলস

আমরা কমবেশি সবাই কাজের ফাঁকে বা অবসর সময়ে মনকে একটু ডানা মেলতে দিই, কিছুটা দিবাস্বপ্ন বা ডে-ড্রিমিং করি। এটি স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সেই রঙিন কল্পনা এতটাই ঘনীভূত ও তীব্র হয় যে তা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাস্তব জীবন থেকে তাঁদের দূরে সরিয়ে রাখে। এই অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন দিবাস্বপ্ন যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কাজ ও সম্পর্ককে ব্যাহত করে, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় ম্যালাডাপ্টিভ ডে-ড্রিমিং।

ইসরায়েলের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির অধ্যাপক ড. ইলাই সোমার ২০০২ সালে প্রথম এই শব্দ উদ্ভাবন করেন। এটি মূলত একধরনের নেতিবাচক মানসিক প্রতিরক্ষা কৌশল, যেখানে মানুষ বাস্তব জীবনের দুঃখ, উদ্বেগ বা মানসিক চাপ থেকে বাঁচতে নিজের কল্পনার জগতে আশ্রয় নেয়।

ম্যালাডাপ্টিভ ডে-ড্রিমিংয়ের বৈশিষ্ট্য

সাধারণ দিবাস্বপ্ন ক্ষণস্থায়ী এবং তা ইচ্ছেমতো থামানো যায়। তবে ম্যালাডাপ্টিভ ডে-ড্রিমিংয়ের ক্ষেত্রে মানুষ এক জটিল ও তীব্র কল্পনার জগতে হারিয়ে যায়।

গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী নাট্যরূপ: এই কল্পনায় ধারাবাহিক চরিত্র, জটিল কাহিনি এবং সুনির্দিষ্ট প্লট থাকে; যা দেখতে অনেকটা চলচ্চিত্র বা টিভি সিরিজের মতো। টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে এই কল্পনার রাজ্যে ডুব দিয়ে থাকা সম্ভব।

বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্নতা: কল্পনার গভীরতা এত বেশি থাকে যে আশপাশের বাস্তব পরিবেশ বা মানুষের উপস্থিতি একরকম উবে যায়।

নিয়ন্ত্রণহীন অভ্যাস ও শারীরিক প্রতিক্রিয়া: এটি একরকম আসক্তির মতো হয়ে দাঁড়ায়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মন বারবার সেই কল্পনার জগতে ফিরে যেতে চায়। অনেক সময় কল্পনার দৃশ্য অনুযায়ী ব্যক্তি একা একা ফিসফিস করে কথা বলেন, অঙ্গভঙ্গি করেন, হাসেন কিংবা এক জায়গায় অনবরত পায়চারি করেন।

কল্পনার গভীরতা এত বেশি থাকে যে আশপাশের বাস্তব পরিবেশ বা মানুষের উপস্থিতি একরকম উবে যায়। ছবি: পেক্সেলস

কারা বেশি আক্রান্ত হন এবং এর বহুমুখী প্রভাব

সাধারণত উদ্বেগ, মানসিক বিষণ্নতা, এডিএইচডি, ওসিডি কিংবা শৈশবের কোনো চরম ট্রমা বা মানসিক আঘাতের অভিজ্ঞতা যাঁদের রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

সামাজিক দক্ষতার বিনাশ: পড়াশোনা, অফিসের কাজ ও পরিবারে মনোযোগ মারাত্মক ব্যাহত হয়। বাস্তব মানুষের চেয়ে কল্পনার চরিত্রদের প্রাধান্য দেওয়ায় ব্যক্তির সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতাও দিনে দিনে দুর্বল হতে থাকে।

অপরাধবোধ ও ঘুমের ঘাটতি: ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় করার পর ব্যক্তি তীব্র লজ্জা, আত্মগ্লানি ও মানসিক অপরাধবোধে ভোগেন। এ ছাড়া রাতে ঘুমোতে যাওয়ার পর এই কাল্পনিক দৃশ্যপট চলতে থাকায় দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রার সমস্যা তৈরি হয়।

শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও একাকিত্ব: ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় বসে বা শুয়ে কল্পনায় ডুবে থাকার ফলে শারীরিক সক্রিয়তা একদম কমে যায়, যা থেকে অলসতা ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়।

প্রতিকার এবং এটি কাটিয়ে ওঠার উপায়

যদিও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সনদে এটি এখনো পৃথক মানসিক ব্যাধি হিসেবে নিবন্ধিত হয়নি, তবে মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার মাধ্যমে এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি: পেশাদার থেরাপিস্টের অধীনে কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপির মাধ্যমে রোগী বুঝতে পারেন, কেন তিনি কল্পনায় পালাচ্ছেন এবং কীভাবে বাস্তব জীবনে মনোযোগ ফেরানো যায়।

ট্রিগার চিহ্নিতকরণ ও মূল সমস্যার চিকিৎসা: গান, সিনেমা বা নিঃসঙ্গতার মতো যেসব বিষয় দিবাস্বপ্ন উসকে দেয়, তা চিহ্নিত করার পাশাপাশি এডিএইচডি, বিষণ্নতা বা ট্রমার মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা নিলে এই প্রবণতা অনেকটাই কমে আসে।

গ্রাউন্ডিং টেকনিক ও মাইন্ডফুলনেস: বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ ধরে রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা, বিশেষ করে স্পর্শ, গন্ধ বা শব্দের মতো পঞ্চেন্দ্রিয় উদ্দীপক কাজ করে বর্তমানে ফিরে আসার পথ খুলে ফেলা যায় সহজে।

সক্রিয় শখ ও নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলা: হাত ও মন সক্রিয় রাখে এমন ক্রিয়েটিভ কাজ করা এবং প্রতিদিনের নির্দিষ্ট সুশৃঙ্খল রুটিন মেনে চলা বেশ এ ধরনের সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে কার্যকরী।

সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক ও অন্যান্য