হোম > জীবনধারা > জেনে নিন

প্রকৃতি, সৌন্দর্য ও অর্থনীতিতে হোক্কাইদোর অরগানিক বিপ্লব

ফিচার ডেস্ক  

জাপানের হোক্কাইদো দেখিয়ে দিচ্ছে, নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদকে ভালোবাসলে এবং স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে চললে রূপচর্চা শিল্পের মাধ্যমে একটি গোটা অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।

জাপানের উত্তরাঞ্চলীয় দ্বীপ হোক্কাইদো। সেখানকার সবুজ প্রান্তর, বরফগলা হ্রদ আর বিশাল প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের আকর্ষণে বাধ্য করে। শুধু তা-ই নয়, দ্বীপটি আধুনিক রূপচর্চার জগতে তৈরি করেছে এক অনন্য বিপ্লব। প্রচলিত রাসায়নিক উপাদানের কৃত্রিমতা ছাড়িয়ে প্রকৃতির কোল থেকে পাওয়া একদম খাঁটি কাঁচামাল দিয়ে প্রসাধন তৈরির নতুন এক দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে সেখানে। স্যামন মাছের পাতলা অংশ, বিটরুট, অ্যাসপারাগাস থেকে শুরু করে বিরচগাছের রস—সবই এখন ব্যবহৃত হচ্ছে ত্বক পরিচর্যার নানা সামগ্রীতে। প্রাকৃতিক ও খাদ্যভিত্তিক উপাদানের প্রতি মানুষের এই ঝোঁক শুধু প্রসাধনশিল্পকেই সমৃদ্ধ করছে এমন নয়। এটি রূপচর্চার হাত ধরে বদলে যাচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং পরিবেশ সংরক্ষণের চিত্রও।

ঘরের কাছের উপাদানে রূপচর্চার জাদু

সম্প্রতি হোক্কাইদো সরকারি কার্যালয়ে এক বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সেখানে স্থানীয় রূপচর্চা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃতি থেকে সংগৃহীত কাঁচামালে তৈরি চমকপ্রদ পণ্য নিয়ে হাজির হয়। সাপ্পোরো শহরের প্রসাধন প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাবিসাল জাপান’ তুলে ধরে সুগার বিট বা চিনি বিটের দানা দিয়ে তৈরি বডি স্ক্রাব। সংবেদনশীল ত্বক, এমনকি অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিসে আক্রান্ত শিশু এবং বয়স্কদের ত্বকের ময়লা দূর করতে এটি অত্যন্ত কার্যকর ও কোমল। প্রদর্শনীতে আরও নজর কাড়ে স্যামন মাছের নাকের তরুণাস্থি থেকে নেওয়া ময়শ্চারাইজিং উপাদান দিয়ে তৈরি সেরাম এবং জাপানি পুদিনা দিয়ে তৈরি সানস্ক্রিন। এসব প্রসাধনী ব্যবহারে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না থাকায় ক্রেতাদের ভরসাও দিন দিন বাড়ছে।

বিশ্ব ঘুরে নিজ আঙিনায় ফিরে দেখা

১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত স্থানীয় রূপচর্চা ব্র্যান্ড ‘শিরো’ ২০২৩ সালে সাপ্পোরো থেকে এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত সুনাগাওয়া শহরে এক বিশাল কারখানা খোলে। প্রতিষ্ঠানটি অ্যাসপারাগাস ও রাওয়ান-বুকি বা একধরনের বৃহৎ বাটারবারসহ হোক্কাইদোর প্রায় ১৩টি প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে প্রসাধন তৈরি করছে। কারখানার ব্যবস্থাপক কোহেই তাকেদার কথায় সেই উপলব্ধির গল্প ফুটে ওঠে। তিনি জানান, সেরা কাঁচামালের খোঁজে তাঁরা গোটা পৃথিবী ঘুরেছেন, অথচ শেষমেশ দেখতে পান সেরা উপাদানগুলো তাঁদের নিজেদের আঙিনাতেই, এই হোক্কাইদোর মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে লুকিয়ে রয়েছে। প্রাকৃতিক এই সৌন্দর্যকে কাছ থেকে দেখতে এবং নিজেদের পছন্দমতো সুগন্ধি তৈরি করতে জুন মাস পর্যন্ত প্রায় ৮ লাখ পর্যটক এই কারখানায় ভিড় করেছেন।

ফ্যাক্টরি ট্যুরিজম এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির প্রাণচঞ্চলতা

প্রসাধন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শুধু কেনাকাটাই নয়, গড়ে উঠেছে ‘ফ্যাক্টরি ট্যুরিজম’ বা কারখানা পর্যটন। যেমন টোকিওভিত্তিক স্কিন কেয়ার কোম্পানি ‘ন্যাচারাল সায়েন্স’ বিফুকায় একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া জুনিয়র হাইস্কুলকে চমৎকার মিউজিয়াম ও কারখানায় রূপান্তর করেছে। জাপানের অন্যতম স্বচ্ছ পানির আধার ‘কুত্তারা হ্রদ’-এর ঝরনার পানি এবং নিজস্ব আঙিনায় চাষ করা ‘ক্যালেন্ডুলা’ ফুল দিয়ে তারা তৈরি করছে বিভিন্ন বিউটি অয়েল ও বডি ক্রিম। বছরে প্রায় ৮০ হাজার দর্শনার্থী এই প্রাঙ্গণ দেখতে আসেন। সবচেয়ে বড় বিষয়, এই কারখানার ৯৪ জন কর্মীর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই স্থানীয় অধিবাসী। এই উদ্যোগ এলাকার বেকারত্ব দূর করতে বড় ভূমিকা রাখছে।

প্রকৃতি সংরক্ষণ ও শিল্পের মেলবন্ধন

জাপানের নামকরা প্রসাধন প্রস্তুতকারী সংস্থা ‘কোসে করপোরেশন’ নিয়েছে আরেক টেকসই পদক্ষেপ। তারা বিফুকা শহরের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি করে সাদা বিরচগাছের রস সংগ্রহ করছে। শুধু রস নিয়েই তারা ক্ষান্ত হয়নি; অবহেলিত বন রক্ষা, নতুন বিরচগাছ রোপণ এবং বনায়নের পুরো খরচ বহন করার দায়িত্বও নিয়েছে। শিল্প ও প্রকৃতির এই ভারসাম্য বজায় রেখে কাজ করার ফলে স্থানীয় অর্থনীতি যেমন চাঙা হচ্ছে, তেমনি বিফুকা শহরও কাঁচামালের এক টেকসই হাব হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাচ্ছে।

একদিকে চীনসহ প্রাচ্যের দেশগুলোতে দেশীয় উপাদান ও প্রসাধনীর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে জাপানের হোক্কাইদো দেখিয়ে দিচ্ছে, কীভাবে নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদকে ভালোবাসলে এবং স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে চললে রূপচর্চা শিল্পের মাধ্যমে একটি গোটা অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।

সূত্র: দ্য ডেইলি মেইল, কায়রো নিউজ