হোম > জীবনধারা > জেনে নিন

বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস

এক জোড়া পরিচ্ছন্ন হাতই সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে সেরা ঢাল​

ডা. কাকলী হালদার

রোগজীবাণুর ছড়িয়ে পড়া রোধে হাত ধোয়া প্রথম ধাপের বাধা হিসেবে কাজ করে। ছবি: পেক্সেলস

নিরাপদ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব হাত ধোঁয়া দিবস। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এটি কেবল কোনো আনুষ্ঠানিক দিবস নয়, বরং একটি জীবন রক্ষাকারী বার্তা প্রসারের প্ল্যাটফর্ম।

সাবান ও পানি দিয়ে ৪০ থেকে ৬০ সেকেন্ড এবং অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড রাব দিয়ে ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড ধরে হাত ঘষতে হবে।

বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস হলো, সাবান দিয়ে সঠিক নিয়মে হাত ধোয়ার অভ্যাসকে একটি বিশ্বব্যাপী সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ। সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়া হলো রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ, সাশ্রয়ী ও কার্যকর মাধ্যম।​ গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং পার্টনারশিপ-এর উদ্যোগে ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালন করা শুরু হয়। সুইডেনের স্টকহোমে বিশ্ব পানি সপ্তাহে এই উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল এবং একই বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০৮ সালকে আন্তর্জাতিক স্যানিটেশন বছর ঘোষণা করে। তখন থেকে বিশ্বজুড়ে ২০০ কোটিরও বেশি মানুষের কাছে বিশেষ করে শিশুদের কাছে হাত ধোয়ার বার্তা পৌঁছে দিতে দিবসটি উদ্‌যাপন করা হয়ে আসছে।​

চলতি বছর বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে, ‘বি এ হ্যান্ডওয়াশিং হিরো!’ এই প্রতিপাদ্যের মূল লক্ষ্য হলো, ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষকে নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব বা হিরো হিসেবে গড়ে তোলা। অর্থাৎ, নিজে সঠিকভাবে হাত ধোয়া এবং অন্যদেরও এই সুস্থ অভ্যাসে উদ্বুদ্ধ করাই এর মূল আহ্বান। ​

হাত ধোয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সাধারণ সাবান ও পরিষ্কার পানি। সাবান ও পানি দিয়ে ৪০ থেকে ৬০ সেকেন্ড ধরে ঘষে হাত ধুয়ে ফেলুন। ছবি: পেক্সেলস

বাসা-বাড়িতে ও হাসপাতালে কেন হাত ধোয়া জরুরি?​ চোখে দেখা না গেলেও আমাদের চারপাশে সব জায়গায় এবং বাতাসে অগণিত অদৃশ্য রোগজীবাণু (ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক) ঘুরে বেড়ায়। হাত হলো মানবদেহের সেই অঙ্গ, যা এসব জীবাণুর বেশি স্পর্শে আসে।​

সুরক্ষার জন্য যা করতে হবে

বাসা-বাড়ির সুরক্ষা: নিত্যদিনের কাজ, রান্নাবান্না, শৌচাগার ব্যবহার বা গৃহস্থালি জিনিসপত্র স্পর্শের মাধ্যমে হাতে সংক্রামক ব্যাধির জীবাণু লেগে থাকে। সেই হাত দিয়ে খাবার খেলে বা মুখে, চোখে ও নাকে স্পর্শ করলে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিস, সর্দি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং পেটের কৃমি খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।​ রোগজীবাণুর ছড়িয়ে পড়া রোধে হাত ধোয়া প্রথম ধাপের বাধা হিসেবে কাজ করে।

হাসপাতালে সংক্রমণ বিস্তার রোধ: হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী, স্বজন ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সব সময় নানা ধরনের শক্তিশালী ও রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে হাত না ধোয়ার ফলে এক রোগীর শরীর থেকে অন্য রোগীর শরীরে এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে হাসপাতালে অর্জিত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। হাত ধোয়ার অভ্যাসই হাসপাতালে সংক্রমণ ছড়ানো ঠেকানোর বড় উপায়।​

কখন হাত ধুতে হবে​

দৈনন্দিন জীবনে এবং স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে হাত ধোয়ার সুনির্দিষ্ট কিছু মুহূর্ত রয়েছে। সেগুলো হলো—

বাসা-বাড়িতে

খাবার প্রস্তুত করা বা রান্না করা ও পরিবেশনের পূর্বে, খাবার খাওয়ার আগে, টয়লেট ব্যবহারের পর, শিশুর ডায়াপার পরিবর্তন বা টয়লেট পরিষ্কার করার পর, কাশি, হাঁচি বা নাক ঝাড়ার পর, অসুস্থ মানুষের পরিচর্যা করার আগে ও পরে, বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর বা ময়লা-আবর্জনা স্পর্শ করার পর, পোষা প্রাণী বা প্রাণীর বর্জ্য স্পর্শ করার পর।​

সাবান ও পানি পাওয়া না গেলে অন্তত ৬০ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে হাত পরিষ্কারের জন্য। ছবি: পেক্সেলস

হাসপাতালে (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৫টি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত)

  • রোগী স্পর্শ করার আগে
  • পরিচ্ছন্নতা বা জীবাণুমুক্ত কাজ করার পূর্বে
  • রোগীর শরীরের তরল পদার্থ (রক্ত, পুঁজ, প্রস্রাব ইত্যাদি) স্পর্শের আশঙ্কার পর
  • রোগী স্পর্শ করার পর
  • রোগীর চারপাশের পরিবেশ বা ব্যবহৃত জিনিসপত্র স্পর্শ করার পর
  • কী দিয়ে, কতক্ষণ এবং কীভাবে হাত ধুতে হবে

সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সাধারণ সাবান ও পরিষ্কার পানি। জীবাণুনাশক সাবান হলে ভালো হয়। তবে যেকোনো সাধারণ ক্ষারযুক্ত সাবানই ত্বকের চর্বিযুক্ত স্তর থেকে জীবাণু আলগা করে পানির সঙ্গে ধুয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম। যদি সাবান ও পানি সহজলভ্য না হয় (যেমন বাইরে চলাচলের সময়), তবে অন্তত ৬০ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে। 

​হাসপাতাল ও রাষ্ট্রের করণীয়

​হাত ধোয়া কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক অভ্যাসের ওপর ছেড়ে না দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

​হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের করণীয়

​ইনফেকশন কন্ট্রোল পলিসি কঠোর করা: প্রতিটি হাসপাতালে ইনফেকশন প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল (আইপিসি) কমিটি সক্রিয় রাখা এবং হাত ধোয়ার হার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা।

পয়েন্ট অব কেয়ারের ব্যবস্থা: রোগীর বেডের পাশে, প্রতিটি ওয়ার্ডে বা পিডিতে পর্যাপ্ত হ্যান্ড ও রানিং ওয়াটার বেসিনের ব্যবস্থা রাখা।

​প্রশিক্ষণ: চিকিৎসক, নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়মিত হাত ধোয়ার সঠিক পদ্ধতির ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া।

রাষ্ট্রের করণীয়

​অবকাঠামোগত উন্নয়ন: দেশের প্রতিটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, গণপরিবহন টার্মিনাল, হাট-বাজার ও পাবলিক প্লেসে নিরবচ্ছিন্ন পানি ও সাবানের সুব্যবস্থা করা।

​জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ: স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বাজেটে পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন খাতে বরাদ্দ বাড়ানো।

​জাতীয় প্রচার ও সামাজিক আন্দোলন: পাঠ্যপুস্তকে ছোটবেলা থেকে হাত ধোয়ার অভ্যাসের গুরুত্ব অন্তর্ভুক্ত করা এবং গণমাধ্যমে বছর জুড়ে নিয়মিত জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো।

পরিচ্ছন্ন হাত কেবল রোগ প্রতিরোধই করে না, বরং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিশুমৃত্যু কমাতে বড় ভূমিকা রাখে। তাই হাত ধোয়ার এই অভ্যাসকে সাময়িক পদক্ষেপ না বানিয়ে আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে একে গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং আহ্বায়ক ও অফিস সেক্রেটারি, বাংলাদেশ ইনফেকশন প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল ফাউন্ডেশন (বিআইপিসিএফ)