ইতালির পাহাড়ঘেরা ছবির মতো সুন্দর অঞ্চল তুস্কানি। আঙুর খেত আর জলপাই বাগানে ঘেরা এই প্রান্তরেই গড়ে উঠেছে সান কাসিয়ানো ইন ভালো দি পেসা নামের এক মধ্যযুগীয় গ্রাম। এত্রুস্কান ও রোমান সভ্যতার স্মৃতি বহন করা এই প্রাচীন পাহাড়ি এলাকা শুধু স্থাপত্যের জন্যই নয়, বিশ্বজুড়ে পরিচিত এর বিখ্যাত এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলের জন্য। এখানেই তৈরি হয় ‘মরিয়মাদো পেনদোলিনো’। এটি এ বছরের অন্যতম সেরা অলিভ অয়েল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
সাধারণত বড় দোকান বা সুপার মার্কেটে বোতলজাত যে অলিভ অয়েল পাওয়া যায়, তা প্রসেসিং, পরিবহন ও দীর্ঘদিনের আলো-বাতাসের সংস্পর্শে এসে গুণমান হারায়। সত্যিকারের কারিগরি তুস্কান অলিভ অয়েল চেনার উপায় একেবারেই আলাদা। আসল তাজা তেল হয় টকটকে সতেজ সবুজ, ফ্যাকাশে হলুদ নয়। বোতল খুললেই তাজা কাটা ঘাস বা সবুজ টমেটোর সতেজ অ্যারোমা পাওয়া যায়। এক চুমুক বা পাউরুটিতে ভিজিয়ে খেলে গলার পেছনের অংশে একধরনের ঝাঁজ বা হালকা পোড়া অনুভূতি তৈরি হয়। এটি কোনো ত্রুটি নয়; বরং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও স্বাস্থ্যকর উপাদান ‘পলিফেনল’-এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ। প্রতিবছর অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাসে যখন নতুন জলপাই মাড়াই করে কাঁচা তেল বের করা হয়, তখন তুস্কানির খামারগুলোতে উৎসবের মেজাজ তৈরি হয়।
অলিভ অয়েলের বোতলে ‘এক্সট্রা ভার্জিন’ লেখা থাকলেই যে তা সর্বোচ্চ মানের, এমন ধারণা ভুল। এই ধারণা বর্তমানে আধুনিক মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কেমিক্যাল অ্যানালাইসিসে প্রতি ১০০ গ্রামে সর্বোচ্চ ০.৮ গ্রাম ফ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড থাকলে তাকে এক্সট্রা ভার্জিন বলা যায়। তবে আশির দশকের শেষের দিকে ইন্টারন্যাশনাল অলিভ অয়েল কাউন্সিল পেশাদার সেন্সরি টেস্ট বা ইন্দ্রিয়ভিত্তিক মূল্যায়নের নিয়ম চালু করে, যা পরবর্তীকালে ক্যালিফোর্নিয়া অলিভ অয়েল কাউন্সিল এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্রহণ করে। ‘স্ট্রিক্টলি অলিভ অয়েল’-এর প্রেসিডেন্ট ন্যান্সি অ্যাশের মতে, এই সেন্সরি টেস্টের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। কোনো একক ব্যক্তি তা মূল্যায়ন করেন না। ৮ জন বিশেষজ্ঞের গ্রুপ যৌথভাবে পয়েন্ট দিয়ে প্যানেল লিডারের স্প্রেডশিটে ডেটা যুক্ত করেন। অলিভ অয়েলের রং দেখে মান বিচার করা ভুল, কারণ কৃত্রিমভাবে রং সবুজ করা যায়। তাই আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী নীল বা লাল রঙের কাচের কাপে তেল ঢালা হয়, যাতে রং দেখা না যায়।
অক্টোবর থেকে নভেম্বরের মধ্যে জলপাই যখন সবুজ থেকে হালকা বেগুনি রঙে রূপ নিতে শুরু করে, ঠিক তখনই সংগ্রহ করা হয়। যান্ত্রিক উপায়ে গাছের ক্ষতি না করে ঐতিহ্যবাহী কাঠের চিরুনি বা রেক দিয়ে জলপাই আঁচড়ে নিচে বিছানো নেটের ওপর ফেলা হয়। ঐতিহ্যবাহী ‘ফ্রান্তোইয়ো’-তে বিশাল দুটি গোলাকার গ্রানাইট পাথর ঘুরিয়ে জলপাইয়ের বীজসহ পুরো ফলটি পিষে পেস্ট বা মণ্ডে পরিণত করা হয়। এ ক্ষেত্রে পাথরের জাঁতা ব্যবহারে সুবিধা হলো এটি অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন করে না। ফলে তেলের প্রাকৃতিক সুবাস ও পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ন থাকে। পাথরে মাড়াই করা মণ্ডটিকে একটি পাত্রে ২০-৩০ মিনিট ধরে ধীরে ধীরে ঘোরানো হয়। এই প্রক্রিয়ার ফলে মণ্ডের ভেতরের ছোট ছোট তেলের ফোঁটাগুলো একত্র হয়ে বড় তেলের বিন্দুতে পরিণত হয়। তাপমাত্রা অবশ্যই ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে হয়, যাকে অফিশিয়ালি ‘কোল্ড প্রেসড’ বলা হয়। মাড়াই করা মণ্ডটি নারিকেলের আঁশ বা সিনথেটিক উপাদান দিয়ে তৈরি গোলাকার ম্যাটের ওপর পাতলা করে লেপে দেওয়া হয়। এরপর একাধিক ম্যাট একটার ওপর আরেকটা সাজিয়ে হাইড্রোলিক প্রেসের নিচে রেখে চাপ দেওয়া হয়। চাপে মণ্ড থেকে তেল ও প্রাকৃতিক পানির মিশ্রণ নির্গত হয়। তেল ও পানি আলাদা করার জন্য ঐতিহ্যগতভাবে মিশ্রণটিকে স্থির পাত্রে রেখে দেওয়া হতো, যাতে হালকা তেল ভেসে ওঠে এবং ভারী পানি নিচে জমা হয়। তবে বর্তমানে গুণমান ও সতেজতা ধরে রাখতে প্রথাগত সেন্ট্রিফিউজ পদ্ধতি ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যে পানি ও খাঁটি তেল আলাদা করা হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবহাওয়া পরিবর্তন ও খরা সত্ত্বেও ইতালির সার্দিনিয়া, মারকে, উমব্রিয়া ও লিম্পুরিয়ার মতো অঞ্চলে প্রতি শরতে শত শত বছরের ঐতিহ্য নিয়ে জলপাই সংগ্রহ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। উমব্রিয়ার ‘ফ্রান্তোই আপের্তি’ কিংবা লিগুরিয়ার ‘অয়েলঅলিভা’র মতো উৎসবে বিশ্বজুড়ে পর্যটকেরা আসেন খামার থেকে সরাসরি কাঁচা তেল চেখে দেখতে। ঐতিহাসিক প্রাচীন স্থাপত্য আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে গিয়ে সরাসরি কোনো খামার বা স্থানীয় ‘ফ্রান্তোইয়ো’ (মাড়াইকল) থেকে তাজা বোতলজাত করা এই তেল সংগ্রহ করাই হলো আসল তুস্কান স্বাদের অভিজ্ঞতা নেওয়ার একমাত্র উপায়।
সূত্র: ইএন ভলস, অলিভ অয়েল প্রফেসর