হোম > জীবনধারা > জেনে নিন

আগামী ৩০ বছরের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে চকলেট, জানাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 

বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, আর ৩০ বছরের মধ্যে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে আমাদের প্রিয় চকলেট! এর কারণ পরিবেশদূষণ। ছবি: পেক্সেলস

চোখ বন্ধ করে একটু ভাবুন, ভীষণ ক্লান্ত দিনে মুখে ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে একটুকরো চকলেট! কিংবা মন খারাপের মুহূর্তে মুখে পুরে দিলেন ক্যাডবারি বা ডার্ক চকলেট। অনেকের কাছে চকলেট একটা আবেগের জায়গা। কেউ ভালোবাসা প্রকাশ করেন চকলেট দিয়ে, আবার স্নেহের বহিঃপ্রকাশও ঘটে চকলেটের মাধ্যমে। আবার অনেকে ‘সরি’ বলার জন্য প্রিয়জনকে চকলেট উপহার দেন। কিন্তু যদি আর মাত্র কয়েক দশক পর এই সুস্বাদু জিনিস পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়? ক্যাভিয়ার বা অভিজাত মোতির মতো শুধু ধনীদের টেবিলেই দেখা মেলে চকলেটের! কথাটা শুনে ভড়কে গেলেন তো? বিভিন্ন গবেষণা কিন্তু এমনই এক আশঙ্কার কথা শোনাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের বরাত দিয়ে জানা যাচ্ছে, আর ৩০ বছরের মধ্যেই চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে আমাদের প্রিয় চকলেট!

চকলেটের কিসের এত সংকট

জলবায়ু পরিবর্তনের মারপ্যাঁচে বিশ্বজুড়ে কোকো চাষ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আছে চকলেট। ছবি: পেক্সেলস

খাস লর্ড অব দ্য চকলেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই গুরুতর সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা অক্সফাম। তাদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের মারপ্যাঁচে বিশ্বজুড়ে কোকো চাষ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে ২০৫০ সালের মধ্যে আজকের কোকো উৎপাদনের অঞ্চলগুলোকে প্রায় ১ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ি এলাকায় সরিয়ে নিতে হবে। অথচ এই পাহাড়ি অঞ্চলের বড় একটি অংশই বর্তমানে বন্য প্রাণীদের অভয়ারণ্য হিসেবে সংরক্ষিত।

আসল খলনায়ক কে

কোকোগাছের জন্য প্রয়োজন হয় আর্দ্র ক্রান্তীয় জলবায়ু এবং মোটামুটি ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৬৮ ডিগ্রি ফারেনহাইটের কাছাকাছি তাপমাত্রা। কিন্তু বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে খরা ও চরম তাপমাত্রা। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ট্রপিক্যাল অ্যাগ্রিকালচারের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট কোকো উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি আসে ঘানা ও আইভরি কোস্ট থেকে। অথচ এই দুই দেশে ২০৫০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেড়ে যাবে। এই অবস্থায় পর্যাপ্ত বৃষ্টিহীনতা এবং অতিরিক্ত গরমে কোকো বীজ টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

কবে নাগাদ পকেট ফাঁকা হতে শুরু করবে

চকলেট একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আগে এর দাম এমন জায়গায় পৌঁছাবে যে সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩০ সালের কাছাকাছি সময়ে চকলেট এক অতি মূল্যবান বিলাসবহুল পণ্যে পরিণত হতে পারে। তবে কোকোগাছ তার পূর্ণতা পেতে প্রায় পাঁচ বছর সময় নেয় এবং এর জীবনকাল প্রায় ৩০ বছর। তাই বর্তমান প্রজন্মের গাছগুলোর ওপর এর প্রভাব হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে পড়বে না, কিন্তু কোকো চাষের পরবর্তী প্রজন্ম পড়বে মারাত্মক বিপাকে।

চকলেট বাঁচাতে কী করছেন বিজ্ঞানীরা

হাত গুটিয়ে বসে নেই গবেষক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশ্বের অন্যতম প্রধান চকলেট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মার্স। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কোকোগাছের ডিএনএ পরিবর্তনে কাজ করছে তারা। ক্রিস্পার প্রযুক্তির সাহায্যে জিন এডিটিং করে এমন কোকোগাছ তৈরির চেষ্টা চলছে, যা খরা ও উষ্ণ আবহাওয়াতেও বেঁচে থাকতে পারে। পাশাপাশি, কৃষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট ড্রাগপ্রতিরোধী কোকোগাছ লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ও টেকসই পদ্ধতি ক্যাব্রুকা ব্যবহার করে জঙ্গলের গাছের ছায়ায় কোকো চাষের পদ্ধতিও প্রয়োগ করা হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান আবার চকলেটের বিশুদ্ধতা কমাতে বিকল্প উপাদান ব্যবহার শুরু করেছে। মজার ব্যাপার হলো, সাদা চকলেট বা হোয়াইট চকলেটে সলিড কোকো থাকে না, শুধু কোকো বাটার, দুধ ও চিনি থাকে বলে এটি হয়তো আরও কিছুদিন বেশি টিকে থাকতে পারে!

ইউসি বার্কলের সায়েন্স কমিউনিকেশন ম্যানেজার মেগান হচস্ট্রাসারের মতে, চকলেট হয়তো হুট করে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে না, তবে পরিস্থিতি বেশ কঠিন। তাই প্রিয় চকলেট বারটি হাতে পেলে ভবিষ্যতে সেটিকে আর অবহেলা করার উপায় থাকবে না; বরং পরম যত্নে তার স্বাদ উপভোগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

সূত্র: ডেইলি মেইল, মিডয়াম, দ্য ডেইলি ডাইজেস্ট