ঢাকায় বসে ঠিক বোঝার উপায় নেই যে হেমন্ত চলে এসেছে। খানিক গরম কমেছে বটে, বাতাসেও কিছুটা হিমের পরশ লেগেছে, ভোরে হিমানীরও দেখা পাওয়া যায়। এতেই বুঝে নিতে হচ্ছে, গরমের দিন শেষ হলো বলে! আর রং? হ্যাঁ, এখানেই প্রকৃতি এখন একেবারে অন্য রকম।
উৎসবের সঙ্গে রঙের একটা যোগাযোগ আছে। হেমন্তে হালকা হলুদের প্রাধান্য থাকে। সঙ্গে থাকে সোনালির পরশ। সবুজ ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে হতে হলুদ হয়ে যায়। প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা ধানের খেতে এখন বার্ধক্য। আর কদিন পরেই সোনালি নাড়ার প্রান্তরের ওপর ভেসে থাকবে কুয়াশার মেঘ। ঠিক এই সময়েই এবার পূজা হচ্ছে। ফলে রঙের দুনিয়ায় খানিক চাপ পড়েছে।
চাপ পড়েছে এই কারণে যে ঠিক ঐতিহ্যবাহী না হলেও দুর্গাপূজায় সাদা জমিনে লালপেড়ে শাড়ির চল বহুদিনের—সে শাড়ি গরদের হোক বা সুতির। কিন্তু আবহাওয়া আর প্রকৃতি সাদার একেবারে কনট্রাস্ট হয়ে দাঁড়ায়, মানে প্রতিপক্ষ। কিন্তু রংটি কী? বলেছি যে প্রান্তরের ধানখেতে এখন বার্ধক্য। ধান ধীরে ধীরে হলুদ থেকে সোনালি হয়ে যাচ্ছে। আর ধানগাছ সবুজ থেকে হলুদ। কিন্তু এখনো ঠিক হলুদ হয়ে ওঠেনি—মাঝামাঝি আছে। এ রকম একটা অবস্থাকে কোন গোত্রের রং বলা যায়, সেটা ভাবনার বিষয়। ধরে নিই এ রং গাঁদা ফুলের মতো। তবে গাঁদা ফুলের হলুদে অল্প মাত্রার সবুজ মেশালে যে রং হয়, মূলত সেই রং। এই সময় প্রকৃতির সঙ্গে পোশাকে দারুণ মেলবন্ধন হবে যদি সেই রঙের পোশাক পরা যায়।
উৎসবে পোশাকের রং নির্দিষ্ট করে দেওয়া মোটেই উচিত নয়। কিন্তু প্রকৃতি তো সেটা মানবে না। তাই হালকা রঙে থাকুন। তাতে চোখের যেমন আরাম হবে, তেমনি সুবিধা পাওয়া যাবে পরিবেশেরও। কার্তিকের খাঁ খাঁ রোদে হঠাৎ করে আপনার দিকে তাকিয়ে কারও চোখ ঝলসে যাবে না। শাড়ি পরবেন নাকি সালোয়ার-কামিজ, নাকি অন্য কিছু সেটি ভেবে নিন। কিন্তু হালকা রঙে থাকুন।
বলা হয়ে থাকে, হেমন্ত কালের প্রধান রং হলো সোনালি। অর্থাৎ পাকা ধানের সোনালি রং এবং নীল। এটি পরিষ্কার নীল আকাশের রং। এর সঙ্গে মেশে হালকা কুয়াশার সাদাটে ভাব ও সবুজের আমেজ। এবার রংটি নিজেই কল্পনা করে নিন।
শাস্ত্রীয় প্রথা না হলেও বিসর্জনে সাদা জমিনের লালপেড়ে শাড়ি পরার চল আছে—সেটা আগেই বলেছি। দশমীর সকালে যেকোনো বয়সের নারীরাই সেটি পরতে পারেন। তাতে স্নিগ্ধ রূপ ফুটে উঠবে। ধূপের ধোঁয়া, বেলি-শাপলার রং আর হালকা কুয়াশার আমেজে সকালটি সাদা-লালের মিশ্রণে পরতেই পরেন। ছেলেরা? সেই সাদা পাঞ্জাবি, তাতে লালের ছোঁয়াও থাকতে পারে সঙ্গে সাদা পায়জামা আর স্ট্রাইপ স্যান্ডেল। মানে একটু আরামে থাকুন। সঙ্গে প্রকৃতি আর উৎসবের আভাস।
সকালের পরেই শুরু হয়ে যাবে দুপুরের খাবারের আয়োজন; রান্নার উপকরণ সংগ্রহ আর কাটা-বাছায় ব্যস্ত সময় পার হবে এ সময়। ফলে খানিক ডার্ক বা গাঢ় রঙের পোশাক এ সময়টার জন্য উপযোগী। কবজি ডুবিয়ে খাওয়াদাওয়া শেষে খানিক বিশ্রাম। তারপর এ বছরের শেষ মেলা ভ্রমণ কিংবা নিমন্ত্রণ রক্ষা। সময়টা গোধূলি থেকে রাত। তাই এ সময় রাতের উপযোগী পোশাক বেছে নিন।
কালোর ওপর সোনালি কাজ করা পোশাক হতে পারে, হতে পারে পুরো সাদা কিংবা নেভি ব্লু রং। পোশাক হতে পারে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ কিংবা হালফ্যাশনের হাইব্রিড। অথবা পূজার ফ্যাশন ম্যাগাজিন থেকে বেছে নেওয়া যেকোনো পোশাক—আপত্তি নেই। মনে রাখতে হবে, উৎসবে পোশাক পরাটা ব্যাকরণ মেনে বাক্য লেখার মতো কঠিন কোনো বিষয় নয়। যে পোশাকে, যে রঙে আপনি স্বচ্ছন্দ, তা-ই বেছে নিন। তাতে কারোরই কিছু বলার নেই।
প্রকৃতির রঙের সঙ্গে মিলিয়ে পোশাক পরলে তাতে একটা ভারসাম্য তৈরি হয়। প্রকৃতিতে এখন পালাবদল চলছে—রঙের ক্ষেত্রে যেমন, আবহাওয়ার ক্ষেত্রেও তেমনই। রং ও আবহাওয়া দুটিই এখন হালকা মেজাজে আছে। তাই হালকা রঙে দশমীর আনন্দ পূর্ণ হয়ে উঠুক।