অনেকের ধারণা, রাতে টানা ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমাতে পারলেই স্বাস্থ্যের যত্ন শেষ। কিন্তু আধুনিক ঘুম গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। ঘুমের মোট সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা ঠিক কোন ধরনের ঘুম পাচ্ছি। বিশেষ করে ঘুমের যে সময়ে আমরা উজ্জ্বল বা বিচিত্র সব স্বপ্ন দেখি, তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় র্যাপিড আই মুভমেন্ট বা আরইএম স্লিপ। এই অবস্থা আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য এক অনন্য সুরক্ষাকবচ। ঘুমে স্বপ্নের দেখা পাওয়া শুধু মনের কোনো কাল্পনিক খেলা নয়। এটি আলঝেইমার, ডিমেনশিয়া বা হৃদ্রোগের মতো ৮৩টি মারাত্মক রোগের ঝুঁকি থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ‘ইউকে বায়োব্যাংক’-এর করা এক গবেষণায় জানা গেছে, স্বপ্নের ঘুম বা আরইএম স্লিপ কীভাবে রোগ প্রতিরোধে কাজ করে। ‘প্লস মেডিসিন’-এ প্রকাশিত চীনের গবেষকদের নেতৃত্বাধীন এই গবেষণা প্রায় নয় বছর ধরে চালানো হয়েছে। সেই গবেষণা ৯৫ হাজার ৫৫৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর চালানো হয়। তাতে উঠে এসেছে, রাতে পর্যাপ্ত স্বপ্নযুক্ত ঘুম আমাদের মস্তিষ্ক, হৃদয় ও মেটাবলিজমকে রিফ্রেশ করে এক দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
সাধারণত ঘুমানোর প্রায় ৯০ মিনিট পর আরইএম বা স্বপ্নের ঘুম শুরু হয় এবং প্রতি ৯০ মিনিট পরপর চক্রাকারে ফিরে আসে। এই সময়ে চোখ দ্রুত নড়াচড়া করে, ব্রেন ইলেকট্রিক্যাল অ্যাকটিভিটিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে অথচ শরীরের পেশিগুলো সাময়িকভাবে অবশ থাকে। এই ধাপেই মানুষ বাস্তবসম্মত ও বিচিত্র সব স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখার এই সময়ে মস্তিষ্ক সারা দিনের স্মৃতি জমা করে, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ায় এবং মানসিক চাপ কমায়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি রাতে গড়ে ৪৭ দশমিক ৬ থেকে ৪৮ মিনিট অতিরিক্ত আরইএম স্লিপ পাওয়া মানুষ ৮৩টি ভিন্ন ভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পান।
স্বপ্ন দেখা মস্তিষ্কের কোষগুলোকে সতেজ রাখে এবং বয়সজনিত স্মৃতিভ্রংশ রোধ করে। এই গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা রাতে বেশি সময় আরইএম স্লিপে থাকেন, তাঁদের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৪৬ শতাংশ কমে যায়। পর্যাপ্ত স্বপ্নের ঘুম পাওয়া মানুষদের পারকিনসনিজমের ঝুঁকি ৮০ শতাংশ কমে যায়। এমনকি সরাসরি পারকিনসন্স রোগের ঝুঁকি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
হৃৎপিণ্ড ও মেটাবলিজম সুরক্ষায় ঘুমের ধাপগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। অতিরিক্ত আরইএম স্লিপ হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি ২৬ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন এবং ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজের ঝুঁকিও কমায়। স্বপ্নের ঘুমের পাশাপাশি গভীর ঘুম বা সলো-ওয়েভ ডিপ স্লিপ মেটাবলিজম ভালো রাখে। প্রতি রাতে অতিরিক্ত ৪৭ দশমিক ৫ মিনিট গভীর ঘুম টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ১১ শতাংশ কমিয়ে দেয়।
রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা প্রতিদিন ভিন্ন সময়ে ঘুমাতে যাওয়া শরীর ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।
পর্যাপ্ত স্বপ্নের ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়, এটি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার অন্যতম চালিকাশক্তি। ঘুম বিশেষজ্ঞ ড. চেলসি রোরশাইবের মতে, দিনে অন্তত ৩০ মিনিট শরীরচর্চা করলে স্ট্রেস হরমোন বা কর্টিসলের মাত্রা কমে, যা ঘুমের মান বাড়ায়। ঘুমানোর ১ ঘণ্টা আগে ল্যাপটপ বা মোবাইল স্ক্রিন বন্ধ করে বই পড়া, হালকা গান শোনা বা কুসুম গরম পানিতে গোসল করা উচিত। এ ছাড়া বেলা ৩টার পর ক্যাফেইন এড়ানো এবং ঘুমানোর দুই ঘণ্টা আগে ভারী খাবার না খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
সূত্র: ডেইলি মেইল