সোশ্যাল মিডিয়ায় যে চর্চাটি হচ্ছে, সেটিই মূলত এই বিষয়। মানে জ্বরে আক্রান্ত স্ত্রীকে মাঝরাতে স্বামী পরোটা বানিয়ে খাওয়ানোর অভিপ্রায় জানিয়েছেন। এটাকে কেউ বলছেন অমানবিক, কেউ বলছেন নির্মম। তবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা আবার একে বলছেন, ‘ম্যানচাইল্ড সিনড্রোম’। মানে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ যখন শিশুসুলভ আচার-আচরণ করেন, তখন তাকে বলা হচ্ছে ম্যানচাইল্ড। শব্দটি এমন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যাঁরা বয়সে বড় হলেও মানসিক, সামাজিক এবং আচরণগতভাবে শিশুর মতো অপরিপক্ব রয়ে যান। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে অনেক সময় পিটার প্যান সিনড্রোমও বলা হয়ে থাকে।
সহজ কথায়, একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ যখন নিজের বয়স অনুযায়ী দায়িত্ব নিতে অসম্মতি প্রকাশ করেন, দৈনন্দিন সাধারণ কাজের জন্য মা, স্ত্রী বা সঙ্গীর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকেন এবং আবেগীয়ভাবে অপরিণত আচরণ করেন, তখনই তাকে ম্যানচাইল্ড বলা হয়।
চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া বলেন, দায়িত্ব এড়ানো এ ধরনের পুরুষের প্রধান বৈশিষ্ট্যের মধ্য়ে অন্যতম। সংসারের খরচ চালানো, সিদ্ধান্ত নেওয়া বা ঘরের সাধারণ কাজগুলো করতে অনীহা প্রকাশ করাও এই দায়িত্ব এড়ানোর মধ্য়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, নিজের কাপড় ধোয়া, খাবার বেড়ে খাওয়া বা ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার মতো মৌলিক কাজের জন্যও সঙ্গী বা মায়ের ওপর নির্ভর করতে তাঁরা দ্বিধা করেন না। এ ছাড়া অল্পতেই রেগে যাওয়া, সমালোচনা সহ্য করতে না পারা এবং নিজের ভুলের জন্য সব সময় অন্যকে দোষারোপ করার ব্যাপারগুলোও তাঁদের মধ্য়ে লক্ষ করা যায়।
এ ধরনের পুরুষ বা ম্যানচাইল্ডরা ক্যারিয়ার বা জীবনের লক্ষ্য নিয়ে গুরুতর চিন্তা না করে কেবল তাৎক্ষণিক আনন্দ, যেমন অতিরিক্ত ভিডিও গেম খেলা, আলসেমি, সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিং নিয়েও মেতে থাকেন।
এই সিনড্রোম বা আচরণগত সমস্যা রাতারাতি তৈরি হয় না। এর পেছনে মূলত ত্রুটিপূর্ণ পারিবারিক লালন-পালন ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি দায়ী থাকে। যেমন
শৈশব বা কৈশোরে মা-বাবা যদি ছেলেকে অতিরিক্ত আগলে রাখেন এবং তার কোনো দায়িত্ব বা ভুলভ্রান্তির মুখোমুখি হতে না দেন, তবে তার মধ্যে স্বনির্ভরতা গড়ে ওঠে না। মায়ের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল থাকার কারণে তারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও সেই কমফোর্ট জোন থেকে বের হতে পারেন না।
বিশেষ করে আমাদের সমাজব্যবস্থায় ছেলেদের প্রায়ই শেখানো হয় যে তাদের কাজ শুধু পড়াশোনা করা ও টাকা উপার্জন করা; ঘরের কোনো কাজ তাদের করতে হবে না। বিপরীতে কন্যাসন্তানকে ছোটবেলা থেকেই ঘর গোছানো, রান্না বা সেবা করার মতো বাস্তবমুখী কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ফলে ছেলেরা ঘরের কাজের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অদক্ষ বা সিস্টেম ফেইলিউরের শিকার হয়ে বড় হয়।
শৈশবে কোনো মানসিক আঘাত বা সঠিক রোল মডেলের অভাব থাকলে একজন মানুষের মানসিক বয়স একটি নির্দিষ্ট স্তরে আটকে যেতে পারে। ফলে শরীরের বৃদ্ধি হলেও মনের দিক থেকে তাঁরা বড় হতে পারেন না।
অনেকের মধ্যে তীব্র আত্মকেন্দ্রিক ও ‘সবাই আমার যত্ন নেবে’ এমন একটি প্রিভিলেজড মানসিকতা কাজ করে। তাঁরা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের কঠিন বাস্তবতা ও জবাবদিহি থেকে বাঁচতে ইচ্ছাকৃতভাবেই শিশুর মতো আচরণ করে সুবিধা নিতে চান। সানজিদা শাহরিয়া বলেন, সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই সিনড্রোম মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারণ, তখন নারী সঙ্গীকে একজন জীবনসঙ্গীর বদলে কেয়ারটেকার বা মায়ের ভূমিকা পালন করতে হয়, যা একপর্যায়ে সম্পর্কে তিক্ততা ও মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি করে।
সূত্র: ইনস্টাইল ও অন্যান্য