অনেক সময় দেখা যায়, ক্যানসার ধরা পড়ে চতুর্থ স্টেজে গিয়ে। তখন কারও কারও ক্ষেত্রে কিছুই করার থাকে না। অথচ জীবনের শুরু থেকে সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপন মেনে চললে যেকোনো ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
ক্যানসার এমন একটি রোগ, যেখানে শরীরের কিছু কোষ স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অস্বাভাবিকভাবে ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে। এই রোগ হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বয়স, বংশগত বৈশিষ্ট্য, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, কিছু রাসায়নিক পদার্থ, বিকিরণ এবং নির্দিষ্ট কিছু সংক্রমণ ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কিছু নির্দিষ্ট জীবাণুর দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। মাইক্রোবায়োলজির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; যেমন হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) জরায়ুমুখ ক্যানসারের প্রধান কারণ। হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস সি ভাইরাস দীর্ঘদিনের সংক্রমণের মাধ্যমে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আবার হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি নামের একটি ব্যাকটেরিয়ার দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে জীবাণুর সংক্রমণ হলে ক্যানসার হবে, এমনটি নয়। অধিকাংশ সংক্রমিত মানুষের ক্যানসার হয় না। দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের সঙ্গে ব্যক্তির বয়স, বংশগত বৈশিষ্ট্য, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও জীবনযাপনের অন্যান্য বিষয় মিলে ঝুঁকি তৈরি করে।
ক্যানসার শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এনে ক্যানসারের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এ জন্য যা করতে হবে—
সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুলসহ সব ধরনের তামাক ক্যানসারের বড় ঝুঁকি। নিজে ধূমপান না করার পাশাপাশি পরোক্ষ ধূমপান থেকে দূরে থাকতে হবে।
প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল, শস্য ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখুন। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্ট ফুড, লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার কমিয়ে দিন। খাবারের পরিমাণের দিকেও নজর রাখা জরুরি।
প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটা বা অন্য কোনো শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভ্যাস করুন। দীর্ঘ সময় একটানা বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটাচলা করুন। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখাও ক্যানসার প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এইচপিভি ও হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ যৌন আচরণ, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং দীর্ঘস্থায়ী কোনো সংক্রমণ থাকলে যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
অতিরিক্ত রোদ থেকে ত্বক সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করতে হবে। নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহারসহ ছাতা, সানগ্লাস ও প্রয়োজনে লম্বা হাতার পোশাক পরতে হবে।
বায়ুদূষণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ এড়াতে হবে বায়ুদূষণ থেকে বাঁচতে মাস্ক পরুন। বাইরে থেকে ফিরে গোসল করতে হবে। ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানযুক্ত খাবার খাওয়া এবং প্রসাধনী ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।
প্রতিদিন খাবার তৈরির আগে ও পরে ভালোভাবে হাত ধোয়া, পরিষ্কার ছুরি ও কাটিং বোর্ড ব্যবহার করা জরুরি। কাঁচা মাংস, মাছ বা ডিম কাটার জন্য ব্যবহৃত বোর্ড বা ছুরি সরাসরি ফল ও সবজি কাটায় ব্যবহার না করা নিরাপদ। কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখতে হবে। কারণ, কাঁচা খাবার থেকে স্যালমোনেলা, ক্যাম্পাইলোব্যাকটার, ই-কোলাই ও বিভিন্ন রোগজীবাণু অন্য খাবারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফল ও সবজি পরিষ্কার প্রবহমান পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে তারপর কাটতে হবে। যেসব ফল বা সবজি কাঁচা খাওয়া হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। কাটা ফল ও সবজি দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় রেখে না দিয়ে দ্রুত খাওয়া বা প্রয়োজন হলে পরিষ্কার, ঢাকনাযুক্ত পাত্রে সংরক্ষণ করা উচিত।
রান্নার সময় খাবার ভালোভাবে সেদ্ধ বা তাপ দিয়ে রান্না করা এবং রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় বাইরে না রাখাও খাদ্যবাহিত সংক্রমণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রান্নাঘরের হাতল, টেবিল, সিঙ্ক ও অন্যান্য স্পর্শকাতর স্থান নিয়মিত পরিষ্কার রাখা উচিত। মনে রাখতে হবে, খাবার দেখতে বা গন্ধে স্বাভাবিক হলেও তাতে রোগজীবাণু থাকতে পারে। তাই খাবার নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা এবং যথাযথ তাপমাত্রায় রান্না ও সংরক্ষণ—এ তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
দৈনন্দিন জীবনযাপনে আনন্দময় মুহূর্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। ভালো হরমোন শুধু মন ভালো রাখে না, শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও বাড়িয়ে তোলে। মনে রাখতে হবে, ক্যানসার মানে জীবন শেষ নয়। অনেক ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে কার্যকরভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব। তাই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, প্রয়োজনীয় টিকা, নিয়মিত স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ—এ চারটি বিষয় জীবনের অংশ করে তুলতে হবে।
ডা. কাকলী হালদার, সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ(ঢাকা মেডিকেল কলেজ)