কোনো গ্রুপ ছবিতে সবাইকে বাধ্য হয়ে আঙুল দিয়ে ‘হার্ট সাইন’ বানাতে দেখলে আপনার মনে কি একধরনের বিরক্তি কাজ করে? কিংবা সবাই যখন একটি ট্রেন্ডের পেছনে অন্ধের মতো ছুটছে, তখন নিজেকে একটু আলাদা ভাবতে ইচ্ছা হয়? অনেকের এমনটা হয়। তাঁরা ট্রেন্ডের বাইরে রাখেন নিজেদের। আবার যাঁরা স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন, তাঁদের কেউ জেনে আবার কেউ নিজের অজান্তেই সেটি করেন।
এদিকে বিভিন্ন ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা জানাচ্ছে, অন্যের দেখাদেখি একই কাজ করার অদ্ভুত তাগিদ কোনো হঠাৎ তৈরি হওয়া ফ্যাশন নয়; এটি মূলত লাখ লাখ বছর ধরে মানব মস্তিষ্কে খোদাই হয়ে থাকা এক প্রাচীন বৈশিষ্ট্য। শিশুর প্রথম হাসির নকল থেকে শুরু করে টিকটকের ভাইরাল নাচ কিংবা এআইয়ের যুগে গণ-অনুকরণ—আমাদের মস্তিষ্কের গভীরে লুকিয়ে আছে কপিক্যাট বা অনুলিপিকারীর এক নিখুঁত কারখানা। থিয়েটারের অভিনয়, বিবর্তন থেকে শুরু করে আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যন্ত মানুষের এই অনুকরণপ্রবণতা বিশ্বকে বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করেছে বিজ্ঞান।
ইউসিএলএর স্নায়ুবিজ্ঞানী মার্কো ইয়াকোবোনি, লস অ্যাঞ্জেলেসের রজার পি উডস ও জন সি মাজিওটা ইতালি ও জার্মানির গবেষকদের সঙ্গে মিলে মস্তিষ্কের অনুকরণক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করেন। গবেষকেরা দেখতে পান, মানুষ যখন কাউকে কোনো কাজ করতে দেখে এবং নিজে সেই একই কাজ করে, তখন মস্তিষ্কের একই অংশ সক্রিয় হয়। ১৯৯০-এর দশকে ইতালির পারমা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা প্রথম বানরের মস্তিষ্কে মিরর নিউরন আবিষ্কার করেছিলেন। ইউসিএলএর গবেষণায় মানব মস্তিষ্কের দুটি অংশ বিশেষভাবে সক্রিয় পাওয়া যায়। ডান প্যারিটাল কর্টেক্স শারীরিক নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে এবং ব্রোকার এরিয়া মূলত ভাষার কেন্দ্র। ইউএসসি ব্রেইন প্রজেক্টের পরিচালক মাইকেল আরবিব ও অন্যান্য বিজ্ঞানী মনে করেন, এই কৌশল মানুষের সামাজিক আচরণ, ভাষা শেখা ও যোগাযোগের মূল ভিত্তি।
থিফানি ওয়াট-স্মিথ দেখিয়েছেন, বিজ্ঞানে অনুকরণ নিয়ে গবেষণার ইতিহাস শুধু নিউরোসায়েন্সের নয়। ১৯ শতকে থিয়েটার ও অভিনয়ের সঙ্গেও এটি জড়িয়ে ছিল।
ফ্রেনোলজি: ১৯ শতকের শুরুতে ফ্রাঞ্জ জোসেফ গল মাথার খুলির আকৃতি মেপে ব্যক্তিত্ব ও ‘অরিজিন অব ইমিটেশন’ খোঁজার চেষ্টা করেন এবং অভিনেতাদের খুলি নিয়ে গবেষণা করেন।
ডারউইনের গবেষণা: ১৮৩০-এর দশকে চার্লস ডারউইন তিয়েরা দেল ফুয়েগোর আদিবাসীদের অনুকরণ করার তীব্র ক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করেন।
মনোবিজ্ঞান ও অনুভূতি: ১৮৮০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানীরা থিয়েটারের অভিনয় ও মানুষের অনুভূতির অনুকরণ নিয়ে পরীক্ষা চালান। জার্মান শারীরবিজ্ঞানীরা এর নাম দেন ‘আইনফ্যুলুং’, যা পরে এমপ্যাথি বা সহানুভূতি হিসেবে পরিচিতি পায়।
বর্তমানে প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের এই অনুলিপি করার প্রবণতাকে নতুন রূপ দিয়েছে।
ভাষা ও চিন্তার যান্ত্রিকীকরণ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ড অনুসরণ করা থেকে শুরু করে এআইয়ের তৈরি লেখা সরাসরি ব্যবহারের ফলে মানুষের চিন্তা ও ভাষা বৈচিত্র্য হারিয়ে যান্ত্রিক ও একই ছাঁচে-ঢালা হয়ে যাচ্ছে। অ্যালগরিদম যা দেখাচ্ছে, মানুষ তা-ই চিন্তা করছে ও রূপ দিচ্ছে।
সৃজনশীলতার সংকট: মানুষের ইতিহাস হলো অন্যের কাজ থেকে ধারণা নিয়ে তাতে নিজের মৌলিকতা যোগ করা। কিন্তু বর্তমান সময়ে মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত চিন্তা না করে সরাসরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা এআইয়ের তৈরি মতামত হুবহু ফটোকপি করছে। নিজের স্বতন্ত্রতা হারিয়ে প্রযুক্তির অনুকরণে অন্ধভাবে ভেসে যাওয়া মানব মস্তিষ্ককে একটি স্থবির, অ্যালগরিদম-চালিত জড়তায় পরিণত করছে।
সূত্র: লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস, বিবিসি, ই ভি এন এক্সপ্রেস