ডিজনির ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’ সিনেমার সেই জাদুকরি দৃশ্যটির কথা মনে আছে? বিশাল রাজকীয় এক লাইব্রেরি, মেঝে থেকে ছাদ ছুঁইছুঁই বইয়ের হাজারো তাক, আর তার মাঝখানে চাকার সঙ্গে যুক্ত সিঁড়িতে চেপে মুগ্ধ চোখে বইয়ের পর বই নেড়েচেড়ে দেখছে বেল। ধূলিমাখা প্রাচীন তোম, চামড়ায় বাঁধানো বইয়ের ম ম গন্ধ আর অজস্র অজানা গল্পের মায়াজাল। সেখানে বেল নিজেকে হারিয়ে ফেলত। প্রতিটি বইপ্রেমীর হৃদয়ে সেই দৃশ্যটি চিরকালের জন্য রূপকথার এক পরম আশ্রয় হয়ে বেঁচে আছে। কল্পনার সেই স্বপ্নপুরী যদি বাস্তব রূপ নিয়ে আপনার সামনে এসে দাঁড়ায়, তবে কেমন লাগবে? অস্ট্রিয়ার ‘আদমোন্ত অ্যাবে লাইব্রেরি’ ঠিক সেই অলৌকিক অভিজ্ঞতারই বাস্তব রূপ। সেখানে পা রাখলেই মনে হবে, পর্দার ওপার থেকে বেল-এর সেই রূপকথার জগৎ যেন সত্যি হয়ে আপনার সামনে ধরা দিয়েছে।
আল্পস পর্বতমালার পাদদেশে, সবুজ উপত্যকা আর এন্স নদীর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে অস্ট্রিয়ার শান্ত-সুন্দর শহর আদমোন্ত। এই শহরের বুক চিরে এগোলেই চোখে পড়বে ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক বিস্ময়। যার নাম বেনেডিক্টাইন সন্ন্যাসীদের প্রাচীন মঠ ‘আদমোন্ত অ্যাবে’। এই মঠের প্রধান আকর্ষণ হলো এর সুবিশাল রাজকীয় লাইব্রেরি। ডিজনির বিখ্যাত অ্যানিমেটেড সিনেমা ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’-এ বেল যেভাবে বইয়ের তাকের মাঝে হারিয়ে যেত, আদমোন্ত লাইব্রেরিতে পা রাখলে প্রতিটি বইপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু ঠিক সেই রূপকথার ভাইবটাই খুঁজে পাবেন।
১০৭৪ সালে স্যালজবার্গের আর্চবিশপ গেবহার্ড স্টাইরিয়া অঞ্চলের এই প্রাচীনতম মঠটি প্রতিষ্ঠা করেন। বেনেডিক্টাইন সন্ন্যাসীরা গত ৯০০ বছরের বেশি সময় ‘ওরা এত লাবোরা এত লেগে’ নীতি মেনে জীবনযাপন করে আসছেন। যার অর্থ ‘প্রার্থনা করো, কাজ করো এবং পাঠ করো’। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মঠের নানা সংস্কার হলেও ১৮৬৫ সালে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুরো মঠ কমপ্লেক্স পুড়ে যায়। তবে অলৌকিকভাবে রক্ষা পায় লাইব্রেরিটি। যুদ্ধের ধাক্কা ও অর্থনৈতিক মন্দা পেরিয়ে আজও ২৩ সন্ন্যাসী এখানে বাস করেন এবং ২৬টি পারিশের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একটি হাইস্কুল পরিচালনা করেন।
১৭৭৬ সালে অ্যাবট ম্যাথিউস অফনারের নির্দেশে অস্ট্রিয়ান স্থপতি জোসেফ হিউবার এই বারোক শৈলীর লাইব্রেরিটি তৈরি করেন। হিউবার ভিয়েনার রাজপ্রাসাদের ঐতিহ্যবাহী ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরিও ডিজাইন করেছিলেন। ৭০ মিটার দীর্ঘ, ১৪ মিটার বিস্তৃত এবং ১১ মিটার উঁচু এই গ্রেট হলে রয়েছে ৪৮টি বিশাল জানালা, যা প্রাকৃতিক আলোয় পুরো হলঘর ভরিয়ে রাখে। হলের সাতটি গম্বুজে বার্টোলোমিও আলতোমোন্তের আঁকা চমৎকার ফ্রেসকো চিত্রকর্ম রয়েছে, যা মানব জ্ঞানের ক্রমবিকাশকে তুলে ধরে। হলের কেন্দ্রে রয়েছে জোসেফ স্টামেলের বানানো বিখ্যাত ‘দ্য ফোর লাস্ট থিংস’ ভাস্কর্য, যা মৃত্যু, বিচার, স্বর্গ ও নরকের প্রতিনিধিত্ব করে। লাইব্রেরির বইয়ের তাকগুলোর মধ্যে রয়েছে কিছু ছদ্মবেশী বা ‘গুপ্ত দরজা’। বাইরে থেকে বইয়ের প্রচ্ছদ মনে হলেও, এগুলো খুললে দেখা যায় দোতলার মেজানাইন গ্যালারিতে ওঠার গোপন সিঁড়ি!
আদমোন্ত লাইব্রেরিকে অনেকে ‘বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য’ বলে থাকেন। এখানে প্রায় ৭০ হাজার মূল্যবান প্রথম সংস্করণ বই সরাসরি কাচের তাকে প্রদর্শিত আছে। তবে এটি শুধু উপরিভাগ—মঠের মূল আর্কাইভে রয়েছে ২ লাখের বেশি বই! যার মধ্যে রয়েছে অষ্টম শতাব্দীর সোনার বাইবেল ও বিরল পাণ্ডুলিপি এবং ১৫০০ সালের আগে ছাপা ৫৩০টি ‘ইঙ্কুনাবুলা’ বা আদি সংস্করণের বই।
আদমোন্ত শুধু অ্যাবে বা লাইব্রেরির জন্যই নয়, বরং এর আশপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যও অনন্য। কাছেই রয়েছে গেসাউস ন্যাশনাল পার্ক। সেখানে চুনাপাথরের পাহাড়, হাইকিং ট্রেইল ও ওয়াটার স্পোর্টসের সুযোগ রয়েছে। ভিয়েনা থেকে প্রতি শনি ও রবিবার সকালে সরাসরি ড্রাইভ বা ৩ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের ট্রেন জার্নি করে সরাসরি আদমোন্তে আসা যায়। ট্রেনের জানালার বাইরে দেখা মেলা আল্পস পর্বতমালার দৃশ্য যাত্রাটিকে আরও রোমাঞ্চকর করে তোলে। বইয়ের প্রচ্ছদে হাত বুলিয়ে ইতিহাস ছোঁয়ার এই আকুলতা আর চোখ মেললেই রেনেসাঁ আমলের চিত্রকলা ও আলোর খেলার দেখা মেলে এই ছাদের নিচে। প্রাচীন তোম, মার্বেলের স্তম্ভ, সোনালি অলংকরণ আর রহস্যময় বইয়ের তাকের মাঝে হাঁটতে হাঁটতে আদমোন্ত অ্যাবে লাইব্রেরিতে আপনার মনে হবে আপনি কোনো সাধারণ লাইব্রেরিতে নন, সত্যি সত্যিই হাঁটছেন রূপকথার কোনো রাজপ্রাসাদে।
সূত্র: ইএন ভলস, থার্ড আই ট্রাভেলার