ঈদুল ফিতর এখন আর ধর্মীয় উৎসবে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত জীবনেও নিয়ে আসে নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাস।
এবারের ঈদ উৎসবে বসন্তের পলাশফুলের আগুনরঙা সাজ আর ভরা ফুলের মধুর ঘ্রাণ যেন শিক্ষার্থীদের আনন্দকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। এবার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) নারী শিক্ষার্থীরা এই আনন্দকে ভিন্নভাবে উদ্যাপন করেছেন—মেহেদি উৎসবের মাধ্যমে।
অ্যাসাইনমেন্ট, ল্যাব, ক্লাস আর পরীক্ষার চাপ উপেক্ষা করে তারা মগ্ন হয়েছে হাতে মেহেদির নকশা আঁকায়। কারও হাতের তালুতে ফুটে উঠছে সূক্ষ্ম লতাপাতার নকশা, কারও হাতে ফুটে উঠছে নানা ফুলের রঙিন ছোঁয়া। এই আয়োজন যেন নারীর স্বাধীনতা ও সাহসিকতার প্রতিচ্ছবি। সমাজের বাঁধাধরা ধারণাকে ভেঙে তারা আজ ব্যস্ত নিজের রঙে নিজেদের প্রকাশ করছে। বহুদিন পর ক্যাম্পাসে এমন আয়োজনের সাক্ষী হয়ে শিক্ষার্থীরা আপ্লুত। তাঁদের মতে, এটি মানসিক চাপ দূর করার চমৎকার উপায়।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। রোদের তীব্রতা কমে গিয়ে সন্ধ্যা নামতেই তারুণ্যদীপ্ত শিক্ষার্থীদের ভিড়ে পুরো প্রাঙ্গণ জমে ওঠে। নিয়নের বর্ণিল আলো আর নানা রঙের মেহেদির নকশা এক অপূর্ব পরিবেশ গড়ে তোলে।
উৎসবস্থলে ঘুরে দেখা যায়, তরুণীরা মনোযোগ দিয়ে নকশা এঁকেছে—কখনো লতাপাতা, আবার কখনো ফুলের প্রতিচ্ছবি। কারও হাতের তালুতে ফুটে উঠছে সূক্ষ্ম আলপনা, কারও হাতে রঙের গভীরতা যেন সূর্যাস্তের মতো। ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই তাদের চোখেমুখে; বরং দেখা যাচ্ছে একরাশ উচ্ছ্বাস, স্বাধীনতার হাসি আর আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি।
বিকেলের সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে আলো কমতে শুরু করে। নিয়নের বর্ণিল আলোতে পুরো প্রাঙ্গণ আলোকিত হয়ে ওঠে। মনে হয়, মেহেদির নকশা শুধু হাতে নয়, চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ নান্দনিক ভঙ্গিমায় ছবি তুলছে, কেউবা চুলে গুঁজেছে সুরভিত ফুল। প্রতিটি মুখে ফুটে উঠেছে উৎসবের আনন্দ—যেন তারা প্রত্যেকে বসন্তের দূত হয়ে উঠেছে।
মেহেদি দিতে আসা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী অনিকা বলেন, ‘কয়েক দিন হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছি। এখানে এসে এমন একটি আয়োজন পেয়ে খুব ভালো লাগছে। স্কুল ও কলেজজীবনে কখনো এ ধরনের আয়োজন দেখিনি। ঈদের আগেই এই আনন্দ ভাগাভাগি করতে পেরে সত্যিই দারুণ লাগছে।’
বাকৃবি ভেটেরিনারি অনুষদের মালয়েশিয়ার শিক্ষার্থী ফাইরোজ বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় এ ধরনের কোনো অভিজ্ঞতা হয়নি। এখানে এসে খুব ভালো লাগছে। সবার দেখে আমিও হাতে মেহেদি রাঙালাম।’
শিক্ষার্থী তানহা তামান্না বলেন, ‘বাকৃবিতে এটিই প্রথম মেহেদি উৎসব। ঈদের আগে হওয়ায় আনন্দের আবহ আরও অন্য রকম। চারপাশের আলোকসজ্জা আর উৎসবমুখর পরিবেশ যেন আমাদের সবাইকে এক পরিবারের মতো করে তুলেছে।’
মোতমাইন্না মুন্নি বলেন, ‘পড়াশোনার ব্যস্ততার মাঝেও মেহেদি উৎসব ছিল এক ভিন্ন রকম আনন্দ। সবাই প্রাণচঞ্চল ছিল, আর হাতে ফুটে উঠছিল রঙিন নকশা। এই অভিজ্ঞতা স্মৃতি হয়ে থাকবে আজীবন।’
প্রতিবছর ঈদের আগে এমন মেহেদি উৎসবের আয়োজন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে সত্যিকারের ঈদের আমেজ। ছোট ছোট আয়োজন, বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়, আর মনে থেকে যাওয়া আনন্দের মুহূর্ত—এটাই হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের আসল সৌন্দর্য।