বর্তমান যুগে আমাদের হাতের মুঠোয় বিনোদনের অভাব নেই। ডিজিটাল এই যুগের জীবন দ্রুতগতিতে চলে। রিলস বা শর্ট-ফর্ম কনটেন্টের প্রভাব এই জীবনে অনেক বেশি। প্রতি মিনিটে স্ক্রল করা রিলস, একের পর এক ভিডিও ক্লিপ আর অবিরাম নোটিফিকেশন আমাদের মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। এই গতিময় জীবনে একটু থিতু হতে হবে। একটু ধীরে চলে জীবনকে গুছিয়ে নিতে হবে। ধীরগতিতে চলা মানে সময় নষ্ট করা নয়; বরং এটি রিচার্জ হওয়ার একটি সুযোগ। এই ব্যস্ত পৃথিবীতে নিজের মস্তিষ্ককে একটু শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেওয়া এখন আর বিলাসিতা নয়। এটি সুস্থ থাকার জন্য অপরিহার্য।
শুধুই প্রতিক্রিয়াপ্রবণ মস্তিষ্ক
আগে আমরা লম্বা কোনো লেকচার শুনতাম বা বই পড়তাম। বিষয়টি আমাদের গভীর চিন্তাভাবনা ও ধৈর্য শেখাত। কিন্তু এখনকার শর্ট-ফর্ম কনটেন্ট মস্তিষ্ককে এমনভাবে তৈরি করছে, যাতে সে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। কয়েক সেকেন্ডেই মনে হতে থাকে, এটি দেখব নাকি স্কিপ করব? ফলে আমাদের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা বা অ্যাটেনশন স্প্যান কমে যাচ্ছে। দ্রুতগতির তথ্যের চাপে সময় আমাদের কাছে ঝাপসা হয়ে যায়। ফলে কয়েক ঘণ্টা স্ক্রল করার পর মনে হয় অনেক সময় ‘হারিয়ে’ গেছে।
ক্লান্ত মস্তিষ্ক
অনেকে অভিযোগ করেন, সারা দিন ভারী কোনো কাজ না করেও তাঁরা প্রচণ্ড ক্লান্তি অনুভব করেন। এর নাম মেন্টাল ফ্যাটিগ বা মানসিক ক্লান্তি। প্রতিবার যখন আমরা নতুন কোনো তথ্যে মনোযোগ দিই বা সিদ্ধান্ত নিই, তখন মস্তিষ্ক শক্তি খরচ করে। তাই স্ক্রিনে রিল চলাকালীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেলায়ও এই শক্তির অপচয় হয়। নোটিফিকেশন আর মেসেজের ভিড়ে আমাদের স্নায়ুতন্ত্র সব সময় ‘অ্যালার্ট’ মোডে থাকে। এই অবিরাম সতর্কতা আমাদের মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে তোলে। শারীরিক ক্লান্তি ঘুমালে দূর হয়। কিন্তু মানসিক ক্লান্তির কোনো শেষবিন্দু নেই। সারা দিন অসংখ্য ছোট ছোট কাজে; যেমন হেডলাইন পড়া, রিঅ্যাক্ট করা, তুলনা করা ইত্যাদিতে মস্তিষ্ক এতই ব্যস্ত থাকে যে দিন শেষে কোনো কারণ ছাড়াই মানুষ অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
ধীরগতির জাদুকরি ক্ষমতা
আমরা যখন ইচ্ছাকৃতভাবে একটু ধীরগতিতে কাজ করি, তখন আমাদের স্নায়ুতন্ত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। স্নায়ুতন্ত্রের এই শিথিলতা আমাদের জন্য জরুরি। ধীরস্থিরভাবে কাজ করলে শরীর ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ মোড থেকে বেরিয়ে রেস্ট অ্যান্ড ডাইজেস্ট মোডে চলে আসে। এতে সৃজনশীলতাও বাড়ে। কারণ, মস্তিষ্ক তখন শুধু তথ্যের উত্তর দেয় না, বরং নতুন ধারণা নিয়ে ভাবতে শুরু করে। ধীরগতিতে কাজ করলে মানসিক স্বচ্ছতা আসে। গভীর শ্বাস নেওয়া বা বিরতি দেওয়ার ফলে মানসিক চাপ কমে এবং মনোযোগ ফিরে আসে।
প্রতিদিনের কাজের গতি ধীর করুন
মানসিক সুস্থতার জন্য রুটিনে আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। ছোট ছোট কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে ভারসাম্য আনা সম্ভব। যা করতে পারেন—
খাবার ও হাঁটা: মোবাইল ফোন না দেখে খাবার খাওয়া বা হেডফোন ছাড়া কিছুক্ষণ হাঁটা মস্তিষ্কের চাপ কমায়। তাই প্রতিদিন এগুলো করা থেকে বিরত থাকুন।
ডিজিটাল ডিটক্স: ঘুম থেকে উঠে প্রথম কয়েক মিনিট মোবাইল ফোন না ধরা এবং সারা দিনের কাজের শেষে একটি ডিজিটাল এন্ড পয়েন্ট বা শেষবিন্দু ঠিক করুন।
মাইক্রো-পজ: নতুন কোনো অ্যাপ খোলার আগে কয়েকবার গভীর শ্বাস নেওয়া বা কোনো কাজ শুরুর আগে ছোট একটি নীরব বিরতি দেওয়া ভালো।
শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের করণীয়
বর্তমান যুগে ডিজিটাল দুনিয়া থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়া সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন ভারসাম্য। তথ্য যেন আপনাকে নিয়ন্ত্রণ না করে, বরং আপনি যেন তথ্যকে নিয়ন্ত্রণ করেন—এই অভ্যাসই পারে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে। এ জন্য যা করতে পারেন—
সূত্র: দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট ও অন্যান্য