পড়াশোনার চাপ, কোচিং আর সোশ্যাল মিডিয়া। এসবের ভিড়ে বর্তমান সময়ের কিশোর-কিশোরীদের জীবন থেকে ঘুম যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ এবং সাংহাইয়ের ফুদান ইউনিভার্সিটির যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য। গবেষকেরা বলছেন, যে কিশোর-কিশোরীরা রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যায় এবং দীর্ঘ সময় ঘুমায়, তাদের মস্তিষ্ক অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি তীক্ষ্ণ এবং কার্যকর হয়। অর্থাৎ, ‘আর্লি টু বেড আর্লি টু রাইজ’ প্রবাদটিই জীবনের চরম সত্য। সুতরাং রাত জেগে পড়াশোনা বা স্ক্রলিং নয়; বরং সুস্থ ও মেধাবী প্রজন্ম গড়তে সঠিক সময়ে ঘুমের কোনো বিকল্প নেই।
যা আছে গবেষণায়
যুক্তরাষ্ট্রের তিন হাজারের বেশি কিশোর-কিশোরীর ওপর দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের এই যৌথ গবেষণা চালানো হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের অভ্যাসের সামান্যতম পার্থক্যও তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। যারা দ্রুত ঘুমাতে যায় এবং বেশি সময় ঘুমায়, তারা কিছু বিষয়ে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকে। এই এগিয়ে থাকার তালিকায় আছে,
পঠন দক্ষতা ও শব্দভান্ডার: তারা দ্রুত পড়তে পারে এবং নতুন শব্দ সহজে আয়ত্ত করে।
সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা: যেকোনো জটিল বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বেশি।
মস্তিষ্কের গঠন: ব্রেন স্ক্যানে দেখা গেছে, যেসব কিশোর পর্যাপ্ত ঘুমায়, তাদের মস্তিষ্কের আয়তন বড় এবং কার্যক্ষমতা উন্নত।
সামান্য পার্থক্য, বিশাল ফল
গবেষণায় চলাকালে কিশোর-কিশোরীদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। অবাক করা বিষয় হলো, যারা সবচেয়ে বেশি এবং যারা সবচেয়ে কম ঘুমিয়েছে, তাদের মধ্যে সময়ের পার্থক্য ছিল মাত্র ১৫-২০ মিনিট। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বারবারা সাহাকিয়ান বলেন, ‘ঘুমের এই সামান্য পার্থক্যই সময়ের সঙ্গে অনেক বড় ব্যবধান তৈরি করে দেয়। ঘুমের মধ্যেই আমাদের স্মৃতিশক্তি মজবুত হয়।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। কিশোর-কিশোরীদের ঘুমের মান বাড়াতে দুটি সহজ উপায় বাতলে দিয়েছেন গবেষকেরা। সেগুলো হলো—
ব্যায়াম: নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম দ্রুত ও গভীর ঘুমে সাহায্য করে।
ডিজিটাল কারফিউ: রাতে ঘুমানোর আগে মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা।
অপর্যাপ্ত ঘুমের ভয়ংকর ঝুঁকি
শুধু বুদ্ধি কমে যাওয়াই নয়, ঘুমের অভাব শরীর ও মনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। সেসব নেতিবাচক প্রভাবের মধ্যে আছে—
শারীরিক সমস্যা: ওজন বৃদ্ধি, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া।
মানসিক স্বাস্থ্য: ঘুম কম হলে বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন এবং উদ্বেগের মতো সমস্যা দেখা দেয়।
মস্তিষ্কের বয়স: যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির মতে, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে মস্তিষ্ক ৩ বছর পর্যন্ত বেশি বুড়িয়ে যেতে পারে এবং স্মৃতিভ্রমের ঝুঁকি বাড়ে।
সন্তানদের স্মার্টফোন থেকে দূরে রাখতে
কিশোর-কিশোরীদের সুস্বাস্থ্য এবং হাসিখুশি মনের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য। স্মার্টফোন ব্যবহারের ওপর সামান্য নিয়ন্ত্রণ আনলে তারা শুধু সুস্থই থাকবে না, বরং তাদের মেধারও বিকাশ ঘটবে।
এ জন্য যা করতে পারেন—
বেডরুমে ‘নো ফোন’ পলিসি: ঘুমানোর সময় শোয়ার ঘরে মোবাইল ফোন রাখবেন না। এই নিয়ম শুধু কিশোরদের জন্য নয়, পরিবারের বড়দের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। এতে মোবাইল ফোনের নীল আলোর প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। পাশাপাশি গভীর ঘুম নিশ্চিত হয়।
অ্যালার্ম ঘড়ির ব্যবহার: অনেকে মোবাইল ফোন অ্যালার্ম ঘড়ি হিসেবে ব্যবহার করেন, যা রাতে এটি ব্যবহারের একটি বড় অজুহাত। খুব সামান্য খরচে একটি অ্যানালগ অ্যালার্ম ঘড়ি কিনে নিন এবং মোবাইল ফোনটি অন্য ঘরে চার্জে রেখে দিন।
অ্যাপ ও প্রযুক্তির সাহায্য: স্মার্টফোনে এমন অনেক অ্যাপ রয়েছে, যা নির্দিষ্ট সময়ের পর সেটিকে শাট-ডাউন বা লক করে দেয়। প্রযুক্তির নেশা কাটাতে প্রযুক্তিরই এই ব্যবহার বেশ কার্যকর হতে পারে।
ঘুমের আগের এক ঘণ্টা: ঘুমানোর ঠিক আগের এক ঘণ্টা মোবাইল ফোন বা ট্যাবলেট ব্যবহার না করে কিছু বিকল্প অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
বিকল্প ব্যবস্থা
বই পড়া: এটি মস্তিষ্ক শান্ত করে।
ডায়েরি লেখা: সারা দিনের কথা লিখে রাখা মানসিক চাপ কমায়।
গোসল করা: হালকা গরম পানিতে গোসল করলে শরীরের পেশি শিথিল হয় এবং দ্রুত ঘুম আসে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ডিজিটাল ডাইজেস্ট