মানুষের আচরণ তাঁকে অন্যের সামনে তুলে ধরে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অতি সাধারণ কিছু আচরণগত পরিবর্তন কীভাবে অন্যের চোখে আমাদের গুরুত্ব এবং ব্যক্তিত্বকে আমূল বদলে দিতে পারে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। অনেকে এই বিষয়গুলোকে বাহ্যিক বা অগভীর মনে করতে পারেন। কিন্তু সত্য এটাই, আমাদের অবচেতন সংকেতগুলো যদি ভুল বার্তা দেয়, তবে আমরা অকারণে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হই। শান্ত আত্মবিশ্বাস এবং মানুষের শ্রদ্ধা অর্জনের সেই শিল্প শেখা ও চর্চার বিষয়। শান্ত আত্মবিশ্বাস বা ‘কোয়াইট কনফিডেন্স’ কোনো জাদুর কাঠি নয়। এটি আপনার প্রতিদিনের অভ্যাসের ফল। আপনি যখন নিজের এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন, তখন মানুষের সম্মান আপনার কাছে প্রাকৃতিকভাবেই চলে আসে। নিজের ওপর কাজ করুন, ধৈর্য ধরুন এবং নিজের স্বকীয়তাকে আলিঙ্গন করুন। তাহলে সম্মান আপনাআপনিই কাছে চলে আসবে।
একজন আত্মবিশ্বাসী ও সম্মানিত মানুষ কখনো অহেতুক তাড়াহুড়ো করেন না। জরুরি অবস্থা ছাড়া সব সময় অস্থির থাকা এই সংকেত দেয়, আপনার জীবনের ওপর আপনার নিয়ন্ত্রণ নেই। জীবনের স্বাভাবিক গতিতে চলা মানেই হলো আপনি যেকোনো পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতা রাখেন। এই ‘রিলাক্সড ওনারশিপ’ বা শান্ত মালিকানাবোধ আপনার ব্যক্তিত্বে আভিজাত্য যোগ করে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে আমাদের মনোযোগের সময় কমে গেছে। তাই আমরা অন্যের কথা শেষ হওয়ার আগেই নিজের মতামত দিতে মরিয়া হয়ে উঠি। কিন্তু কারও কথা মাঝপথে থামিয়ে দেওয়া মানে হলো আপনি নিজের ওপর এবং নিজের কথার ওপর আস্থা হারানো। আপনি যখন অন্যকে পূর্ণ সুযোগ দেন, তখন তা আপনার নেতৃত্বের গুণাবলি প্রকাশ করে। মানুষ অবচেতনভাবেই আপনাকে শ্রদ্ধা করতে শুরু করে। সক্রিয়ভাবে শোনার অভ্যাস করুন। শ্রদ্ধা পাওয়ার প্রথম শর্ত হলো অন্যকে শ্রদ্ধা দেওয়া। সক্রিয়ভাবে শোনার অর্থ কেবল আপনার বলার পালা আসার জন্য অপেক্ষা করা নয়, বরং বক্তার প্রতি প্রকৃত আগ্রহ দেখানো। এটি ধৈর্য ও নম্রতার পরিচয় দেয়। আপনি যখন মানুষের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনেন, তারা আপনার মতামতকেও সমান গুরুত্ব দিতে শুরু করে। এটি আপনার চারপাশে একধরনের বিজ্ঞতা ও চিন্তাশীলতার আভা তৈরি করে।
ভুল স্বীকার করা বা যুক্তিসংগত কারণে নিজের মতামত পরিবর্তন করা মহানুভবতা। কিন্তু যদি আপনি অন্যের চাপে পড়ে বারবার এবং দ্রুত নিজের সিদ্ধান্ত বদলান, তবে আপনি মানুষের শ্রদ্ধা হারাবেন। দৃঢ়তা ও নমনীয়তার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখাই হলো ব্যক্তিত্বের আসল পরীক্ষা। বিপদে পড়লে আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান, তা আপনার আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দেয়। ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানো একধরনের মানসিক শক্তি। মানুষ স্বভাবতই তাদের শ্রদ্ধা করে, যারা ঝড়ের মাঝেও শান্ত থাকতে পারে এবং শক্ত হাতে হাল ধরতে জানে।
মনোবিজ্ঞানে ‘বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ইফেক্ট’ বলে একটি কথা আছে। আমাদের প্রতিটি ছোট কাজ আমাদের চরিত্রের একটি বড় ছবি তৈরি করে। আপনার নীতি ও নৈতিকতা যদি পরিস্থিতির সাথে বদলে না যায়, তবে মানুষ আপনাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করে। আপনার কথা ও কাজের মিল বা সামঞ্জস্যতা আপনার চারিত্রিক দৃঢ়তার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। বিনয় মানে নিজের দক্ষতা কমিয়ে দেখা নয়। উল্টো এর অর্থ এটি স্বীকার করা, আপনার এখনো অনেক কিছু শেখার আছে। যখন আপনি নিজের ভুলের জন্য বা কোনো কনিষ্ঠ সহকর্মীর ভালো পরামর্শের জন্য নিজের ইগো বা অহংবোধ বিসর্জন দিতে পারেন, তখন মানুষের চোখে আপনার উচ্চতা বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি প্রমাণ করে, আপনার জ্ঞানের তৃষ্ণা আপনার ইগোর চেয়ে বড়।
অন্যের জুতায় পা গলিয়ে তার পরিস্থিতি বুঝতে পারা বা অন্যের আবেগ শেয়ার করা কোনো দুর্বলতা নয়। বরং এটি প্রচণ্ড মানসিক শক্তির পরিচয়। যখন আপনি অন্যের কষ্ট বা পরিস্থিতি বুঝতে পারেন, তখন আপনি কেবল একজন নেতা নন, একজন দরদি মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। এই সহমর্মিতা আপনাকে মানুষের সঙ্গে গভীর স্তরে সংযুক্ত করে। নিখুঁত হওয়ার লড়াই একটি অন্তহীন দৌড়, যা কেবল মানসিক চাপই বাড়ায়। আমরা সবাই মানুষ এবং আমাদের ভুল হওয়া স্বাভাবিক। নিজের ভুল বা অপূর্ণতাকে সাহসের সঙ্গে স্বীকার করা এবং তা থেকে শেখার মানসিকতা আপনাকে মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য ও ‘অথেনটিক’ করে তোলে। এই সততা মানুষকে আপনার দিকে আকৃষ্ট করে।
কৃতজ্ঞতা কেবল নিজের মনকে ভালো রাখে না, এটি অন্যকেও উৎসাহিত করে। মানুষের অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া এবং ছোট ছোট বিষয়েও ‘ধন্যবাদ’ বলা আপনার ব্যক্তিত্বের ইতিবাচক দিকটি ফুটিয়ে তোলে। এটি দেখায়, আপনি হীনম্মন্যতা বা ঈর্ষায় ভুগছেন না, বরং অন্যের সাফল্যে আপনি আনন্দিত হতে জানেন। আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে হলো নিজের প্রতি সৎ থাকা। নকল মুখোশ পরে বেশি দিন শ্রদ্ধা ধরে রাখা যায় না। আপনার বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং মতামতের প্রতি অটল থাকাই হলো প্রকৃত আত্মবিশ্বাস। যখন আপনি যা বলছেন এবং যা করছেন, তার মধ্যে কোনো ফারাক থাকে না, তখন মানুষ আপনাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করে।
সূত্র: মিডিয়াম, গ্লোবাল ইংলিশ এডিটিং