কর্মক্ষেত্রে ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে অর্থ বোনাস প্রদান অনেক প্রতিষ্ঠানের পরিচিত পদ্ধতি। অধিকাংশ করপোরেট সংস্কৃতিতে মনে করা হয়, আর্থিক পুরস্কার কর্মীদের উৎসাহ বাড়ায় এবং কর্মদক্ষতা উন্নত করে। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, সব সময় অর্থ নয়, তার চেয়ে অতিরিক্ত ছুটি কর্মীদের মানসিক সন্তুষ্টি এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাঁদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে আরও বেশি কাজে দেয়।
গবেষণাটি পরিচালনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের অ্যান্ডারসন স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক স্যানফোর্ড ডিভোয়ের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল।
গবেষকদের মতে, কর্মীদের সুখ ও দীর্ঘমেয়াদি কাজের দক্ষতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর মানবিক মূল্যায়নের সম্পর্ক রয়েছে। কর্মীরা যখন মনে করেন, প্রতিষ্ঠান তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন তাঁরা কাজে আরও মনোযোগী ও দায়িত্বশীল হন।
কর্মীদের অনুভূতির পার্থক্য
গবেষণার জন্য জরিপে অংশ নেন প্রায় ১ হাজার ৫০০ কর্মী। অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তাঁরা যখন অর্থ বোনাস পেয়েছেন, তখন কেমন অনুভব করেছেন এবং যখন ছুটি পেয়েছেন, তখন তাঁদের অনুভূতি কেমন ছিল।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের অনুভূতি মাপার জন্য ১ থেকে ৭ পর্যন্ত মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়েছিল। এখানে ১ মানে খুব অসন্তুষ্ট বা খারাপ অনুভূতি, আর ৭ মানে খুব বেশি সন্তুষ্ট বা ভালো অনুভূতি। দেখা গেছে, বোনাস পেলে কর্মীদের সন্তুষ্টির গড় স্কোর ছিল ৫ দশমিক শূন্য ৪। আর অতিরিক্ত ছুটি পেলে সেই সন্তুষ্টির গড় স্কোর ছিল ৫ দশমিক ৪। অর্থাৎ দুটিতেই কর্মীরা মোটামুটি সন্তুষ্ট ছিলেন, তবে ছুটি পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা একটু বেশি ভালো অনুভব করেছেন।
গবেষকদের মতে, এই পার্থক্য সংখ্যার বিচারে খুব বড় না মনে হলেও এটি কর্মীদের মানসিক অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। স্যানফোর্ড ডিভোয় বলেন, ‘মানুষ হিসেবে মূল্যায়িত হওয়ার অনুভূতি কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে সন্তুষ্টি বাড়ায়, সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য বৃদ্ধি করে।’
কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য
গবেষণার আরেকটি ধাপে ৫০০ জনকে নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, যেসব কর্মী অতিরিক্ত ছুটি পেয়েছিলেন, তাঁরা ছুটির সময় কাজের চিন্তা থেকে দূরে থাকতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের মানসিক সুস্থতার জন্য কাজ থেকে কিছু সময় বিরতি নেওয়া খুব প্রয়োজন। এতে মন ও শরীর বিশ্রাম পায়। এই বিশ্রামের কারণে কর্মীরা পরে কাজে ফিরে আরও সতেজ ও মনোযোগী হয়ে কাজ করতে পারেন।
বর্তমানে অনেক কর্মীর সমস্যা হলো, অফিস শেষ হলেও কাজের চাপ শেষ হয় না। মোবাইল ফোনে ই-মেইল দেখা, অফিসের মেসেজের উত্তর দেওয়া বা অনলাইন মিটিংয়ের কারণে ব্যক্তিগত সময়ও কাজের মধ্যে চলে যায়। এতে ধীরে ধীরে মানসিক চাপ বাড়ে এবং ক্লান্তি তৈরি হয়। গবেষণাটি দেখিয়েছে, নিয়মিত ছুটি এই চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং কর্মীদের মানসিকভাবে ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ছুটির সময় অফিস যোগাযোগের প্রভাব
গবেষণার আরেকটি ধাপে ২০০ জনকে নিয়ে একটি পরীক্ষা করা হয়। তাঁরা ছুটিতে আছেন—এমনটা কল্পনা করতে বলা হয় তাঁদের। এরপর দেখা যায়, ছুটির সময় তাঁরা যদি মোবাইল ফোনে মেসেজ বা কল পান, তাহলে তাঁদের অনুভূতি কেমন হয়। একদলকে ভাবতে বলা হয়, তাঁরা বন্ধুদের কাছ থেকে মেসেজ পাচ্ছেন, আর অন্য দলকে ভাবতে বলা হয়, তাঁরা অফিসের বসের কাছ থেকে কাজসংক্রান্ত মেসেজ পাচ্ছেন।
ফলাফলে দেখা যায়, যাঁরা বসের কাছ থেকে কাজের মেসেজ পাওয়ার কথা ভেবেছিলেন, তাঁরা কম স্বস্তি অনুভব করেছেন। অন্যদিকে যাঁরা বন্ধুদের মেসেজ পাওয়ার কথা ভেবেছিলেন, তাঁরা বেশি স্বস্তি ও আনন্দ অনুভব করেন। গবেষকদের মতে, ছুটির সময় অফিস থেকে কাজসংক্রান্ত যোগাযোগ কর্মীদের মানসিক বিশ্রাম নষ্ট করতে পারে। শুধু ছুটি নেওয়া নয়, ছুটির সময় কাজের চিন্তা থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা জরুরি।
বর্তমান কর্মসংস্কৃতিতে কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই গবেষণা দেখিয়েছে, কর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ তৈরি করা শুধু মানবিক উদ্যোগ নয়, এটি ব্যবস্থাপনা কৌশলও হতে পারে।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল