দারিদ্র্য, সংগ্রাম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্পে ভরপুর এক জীবনের নাম ডেভিড ওয়ালেনটাস। একসময় যিনি খাবারের জন্য নিজের রক্ত বিক্রি করেছিলেন, সেই মানুষটিই আজ বিলিয়ন ডলারের রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্যের মালিক। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের জরাজীর্ণ নিম্নভূমিকে আধুনিক ও প্রাণবন্ত ডাম্বো এলাকায় রূপান্তর করে তিনি হয়েছেন এখন অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
ফোর্বস জানিয়েছে, মহামন্দার সময় নিউইয়র্কের রচেস্টারে জন্ম নেওয়া ওয়ালেনটাসের শৈশব ছিল অত্যন্ত কঠিন। তাঁর বাবা যখন স্ট্রোক করে পঙ্গু হয়ে পড়েন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র পাঁচ। সংসারের দায়িত্ব পড়ে মায়ের ওপর। আর্থিক সংকট এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে যে, ছোট ভাইকে সহ তাঁকে কাছের একটি খামারে কাজ করতে পাঠানো হয়। ভোর পাঁচটায় উঠে গরু দোহন, খামারের কাজ, তারপর স্কুল—এই ছিল তাঁদের প্রতিদিনের জীবন। কঠিন সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে শিখিয়েছে—জীবনে সফল হতে হলে কষ্টকে আলিঙ্গন করতে হয়।
এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পেরিয়ে ওয়ালেনটাস শিখেছেন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জীবন-শিক্ষা। প্রথমত, তিনি বিশ্বাস করেন—যে কাজ অন্যরা করতে চায় না, সেখানেই সুযোগ লুকিয়ে থাকে। খামারের অভিজ্ঞতা তাঁকে এমন কাজ করতে সাহস দিয়েছে, যা অন্যরা এড়িয়ে চলে। একসময় তিনি গ্রিনল্যান্ডে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কারের কাজও করেছেন। দিনে ১০ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন কাজ করেছেন নিরলসভাবে। এই মানসিকতাই তাঁকে পরবর্তীতে বড় বড় ঝুঁকি নিতে সাহায্য করেছে।
দ্বিতীয়ত, নতুন অভিজ্ঞতা জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার আরওটিসি প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়া ছিল তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। সেখানে তিনি এমন এক সামাজিক পরিবেশে প্রবেশ করেন, যা তাঁর চিন্তাধারাকে বিস্তৃত করে। নতুন মানুষের সংস্পর্শে এসে তিনি নিজের ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে দেখতে শিখেন।
তৃতীয় শিক্ষা—যা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, তা নিজের করা উচিত নয়। তিনি জীবনের প্রথম বিনিয়োগ করেছিলেন একটি ছোট খামারবাড়িতে। কিন্তু দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সেই বিনিয়োগ প্রায় ডুবে যায়। এখান থেকেই তিনি শিখেছিলেন, ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীতে তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘টু ট্রিজ ম্যানেজমেন্ট’-এ সব সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা নিজেই নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
চতুর্থত, নিজের অন্তর্দৃষ্টি অনুসরণ করা জরুরি। ১৯৬০-এর দশকে নিউইয়র্কে কাজ করার সময় তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর আসল আগ্রহ রিয়েল এস্টেটে। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি ক্যারিয়ার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মতে, তরুণ বয়সে ঝুঁকি নেওয়া উচিত—ব্যর্থ হলেও নতুন করে শুরু করার সুযোগ থাকে।
পঞ্চম শিক্ষা—বড় ঝুঁকি নিতে হবে। ব্রুকলিনের ডাম্বো এলাকা একসময় ছিল অবহেলিত শিল্পাঞ্চল। ব্যাংকগুলো সেখানে বিনিয়োগ করতে অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু ওয়ালেনটাস নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে অটল থাকেন। ব্যক্তিগত বিনিয়োগ সংগ্রহ করে এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক লড়াইয়ের মাধ্যমে তিনি সেই এলাকাকে আজকের জনপ্রিয় আবাসিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপ দেন।
সবশেষে, জীবনের সঠিক সঙ্গী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি হলো তাঁর স্ত্রীকে বিয়ে করা। তাঁর স্ত্রী জেন তাঁকে শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, পেশাগতভাবেও সমর্থন দিয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করতে সাহায্য করেছেন।
আজ ডেভিড ওয়ালেনটাস-এর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু তাঁর জীবনের আসল মূল্য শুধু এই অর্থ নয়—বরং সেই কঠিন পথচলার শিক্ষা, যা প্রমাণ করে, সংকটই মানুষকে সবচেয়ে বড় শক্তি দেয়।