বিশ্বভ্রমণ মানেই চড়তে হবে উড়োজাহাজে—এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এক ভিন্নধর্মী অভিযানে নেমেছেন মিসরের তরুণ ভ্রমণকারী ওমর নক। ৩১ বছর বয়সী এই অভিযাত্রী পৃথিবী ঘুরে দেখার স্বপ্ন পূরণ করছেন সম্পূর্ণ উড়োজাহাজবিহীন পথে। এই পথে তাঁর সঙ্গী কখনো উট, কখনো পালতোলা নৌকা, আবার কখনো মুরগি বোঝাই ট্রাক।
সম্প্রতি ক্যারিবীয় দ্বীপ সেন্ট লুসিয়ার তীরে পৌঁছানোর মুহূর্তটি ছিল ওমরের জন্য এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সপ্তাহের পর সপ্তাহ শুধু সমুদ্র দেখার পর যখন দূরে ভূমি দেখা গেল, তখন বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যান তিনি। ইউনেসকো তালিকাভুক্ত পিটন পর্বতমালার সৌন্দর্য তাঁকে মুগ্ধ করে। এটি ছিল তাঁর এই ব্যতিক্রমী যাত্রার দশম গন্তব্য।
গত বছরের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রায় ওমর জাহাজে চড়েছেন, মরুভূমি পাড়ি দিয়েছেন উটে, আবার কখনো অপরিচিত মানুষের সাহায্যে পথ চলেছেন। তাঁর মতে, উড়োজাহাজ এড়িয়ে চলার কারণে পৃথিবীকে আরও গভীরভাবে দেখা সম্ভব হয়। দূরত্ব অতিক্রমের কষ্টই গন্তব্যে পৌঁছানোর আনন্দকে বাড়িয়ে দেয়।
শৈশব থেকেই ভ্রমণের প্রতি আগ্রহ থাকলেও ২০১৮ সালে বলকান অঞ্চলে পরিকল্পনাবিহীন এক হুট-হাট ভ্রমণ তাঁর মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করে। পরে ২০২২ সালে অ্যামাজনে কর্মরত অবস্থায় চাকরি ছেড়ে দেন তিনি এবং সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করে পূর্ণকালীন ভ্রমণ শুরু করেন।
২০২৪ সালে জাপানে সাত মাসের এক সফরের সময় তিনি ‘ইকিগাই’ দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হন—যা জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়ার ধারণা দেয়। তখনই তিনি উপলব্ধি করেন, তাঁর জীবনের উদ্দেশ্যই হলো দীর্ঘমেয়াদি উড়োজাহাজবিহীন বিশ্বভ্রমণ।
২০২৫ সালের অক্টোবরে কায়রো থেকে যাত্রা শুরু করে তিনি মিশর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া পেরিয়ে ইউরোপে পৌঁছান। এরপর ফ্রান্স ও স্পেন হয়ে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে যান এবং সেখান থেকে ৩০ ঘণ্টার ফেরি যাত্রা শেষে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ক্যারিবীয় অঞ্চলে পৌঁছান।
তাঁর যাত্রাপথ মোটেই সহজ ছিল না। বিশেষ করে লিবিয়ার উত্তরাঞ্চলে বেনগাজি থেকে ত্রিপোলি যাওয়ার পথে নানা চেকপয়েন্ট ও কাগজপত্র জটিলতায় পড়তে হয় তাঁকে। একপর্যায়ে তাঁর যাত্রা থমকে গেলেও স্থানীয় এক বন্ধুর সহায়তায় আবার এগিয়ে যেতে সক্ষম হন।
ওমর নক তাঁর এই অভিজ্ঞতাগুলো সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিত শেয়ার করছেন। ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও ইউটিউবে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা প্রায় দশ লাখে পৌঁছেছে। এমনকি এক ভক্ত তাঁর জন্য লিবিয়ায় প্রবেশের জন্য ভিসার আমন্ত্রণপত্রও জোগাড় করে দেন।
বর্তমানে তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে দ্বীপ থেকে দ্বীপে ঘুরছেন এবং ডমিনিকান প্রজাতন্ত্রে পৌঁছেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও ভিসা জটিলতায় তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এখন তাঁর লক্ষ্য লাতিন আমেরিকা।
বিশ্ব রাজনীতি ও অস্থিরতার মধ্যেও ওমর নক আশাবাদী। তাঁর বিশ্বাস, পৃথিবী মূলত মানুষের—কোনো সরকারের নয়। মানুষের আন্তরিকতা ও সহমর্মিতাই তাঁর এই যাত্রার সবচেয়ে বড় শক্তি।
সিএনএন অবলম্বনে