উনিশ শতকের শেষের অংশে বাংলা সাহিত্যে পদচারণ করা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পের নায়িকাদের সাজসজ্জা আজও ফ্যাশনসচেতন নারীর কাছে অনুকরণীয়। ‘নষ্টনীড়ে’র চারুলতা, ‘ঘরে-বাইরে’র বিমলা, ‘নৌকাডুবি’র হেমনলিনী বা ‘শেষের কবিতা’র লাবণ্য খোঁপা বেঁধেছে নানান ঢংয়ে। কারও খোঁপার ঘূর্ণনে শোভা পেয়েছে সোনার কাঁটা, ফিতে বা কেউ হাতখোঁপা করেই পরিপাটি হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গল্প, উপন্যাস বা গান সবকিছুতেই নারীর স্নিগ্ধ সাজের নানা রূপ খুঁজে পাওয়া যায় অনায়াসে।
রবীন্দ্রনাথের গান বা বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে এসব সাজ বিভিন্ন সময় শোভা পেয়েছে ফ্যাশন-সচেতন নারীর চোখে, কপালে, চুলে আর পরিধেয়তে। রবীন্দ্রপ্রেমীরা ছাড়াও সৌন্দর্যপ্রিয় সবাই প্রেমে পড়েছেন এই সাজসজ্জার।
নানা ঢঙে পরা শাড়ি ও রকমারি ব্লাউজের আভিজাত্য
শাড়ির প্রসঙ্গ দিয়েই যদি শুরু করা যায়, তাহলে রবিঠাকুরের গল্প অবলম্বনে যেসব সিনেমা নির্মিত হয়েছে, তাতে দুই ঘরানায় শাড়ি পরতে দেখা যায় নায়িকাদের। সাধারণ কুঁচি দিয়ে কাঁধের ওপর আঁচল ফেলে রাখা শহুরে ঘরানায়। আর শাড়ি পরে একটু কুঁচি গুঁজে এরপর এক প্যাঁচে কাঁধের ওপর আঁচল তুলে ডান হাতের নিচ থেকে আঁচলের শেষাংশ তুলে নিয়ে বাম কাঁধের ওপর পিন দিয়ে সেঁটে দেওয়া। শহুরে ঘরানায় আবার ব্রোচের ব্যবহার দেখা যায়। সুতি, সিল্ক, জামদানি, কাতান এ ধরনের শাড়িই বেশি চোখে পড়ে। তবে এই শাড়ি পরার ধরনের চেয়ে যা বেশি নজর কাড়ে তা হলো, এর সঙ্গে ব্যবহৃত ব্লাউজগুলো। শাড়ির সঙ্গে পরার জন্য বিভিন্ন ধরনের লেইস দিয়ে তৈরি ভিক্টোরিয়ান ব্লাউজগুলো কিন্তু চলতি সময়েও বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বাঙালি নারীরা উৎসবে তো বটেই, এমনি এমনিও এ প্যাটার্নের ব্লাউজ পরতে ভালোবাসে। সে সময়কার কুঁচি হাতা ও উঁচু গলার ভিক্টোরিয়ান ব্লাউজগুলো অনেকটা আজকের বোহো-ফ্যাশন ট্রেন্ডের মতোই ছিল। অনেক ফ্যাশন ডিজাইনার ইদানীং তৈরি করছেন সেই ধাঁচের ব্লাউজ। এখন অনলাইনে পোশাকের পেজগুলোতেও চোখে পড়ে বিভিন্ন স্টাইলের ভিক্টোরিয়ান ব্লাউজ। এসব ব্লাউজের সঙ্গে ড্র্যাপিং স্টাইলে শাড়ি পরছেন নারীরা।
একটি বিন্দু এঁকো তোমার ললাট চন্দনে
আমার লতার একটি মুকুল
ভুলিয়া তুলিয়া রেখো—
তোমার অলকবন্ধনে।
আমার স্মরণ শুভ-সিন্দুরে
একটি বিন্দু এঁকো—
তোমার ললাটচন্দনে।।
‘ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে’ গানটি শুনতে শুনতে চোখে ভেসে ওঠে কোমল স্নিগ্ধ এক নারীর অবয়ব। ভেসে ওঠে এক ভিন্ন ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। এই স্টেটমেন্ট গড়ে ওঠে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের মিনিমালিস্টিক জীবনবোধ এবং অবচেতনে থাকা জমিদারি আভিজাত্য ঘিরে। রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্যায়ের রোমান্টিকতার আবেশ যেন তাঁর ফ্যাশন স্টেটমেন্টে ধরা দেয়। স্নান শেষে নিজ ঘরে আয়নার সামনে বসে পরম যত্নে নিজেকে সাজিয়ে তুলছেন এক নারী। স্নানের আগে বাগান থেকে তুলে আনা ফুল, ঝকঝকে রুপার নূপুর, সোনার বালা, চন্দনের কৌটো পড়ে আছে তাঁর সামনে। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মধুর হাসিতে প্রিয়তমর অনুভব যেন স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় চোখের সামনে। এমন চিত্রকল্প রবীন্দ্রনাথে ছড়াছড়ি। ভ্রু যুগলের মধ্যিখান থেকে টিপ কবেই উঠেছে আরেকটু ওপরে। রবীন্দ্রনাথের নায়িকাদের কপালের মাঝখানে বরাবরই শোভা পেয়েছে ছোট-বড় টিপ। আশপাশে চোখ রাখলে দেখা যায়, এখন অনেক নারীই অনুসরণ করছেন এই লুক।
কাজল নয়নে যূথী মালা গলে
‘দাও আকুলিয়া ঘন কালো কেশ, পরো দেহ ঘেরি মেঘনীল বেশ—
কাজলনয়নে, যূথীমালা গলে, এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে॥
রবীন্দ্র ঘরানার সাজের যে অনুষঙ্গ একেবারেই উপেক্ষা করা যায় না, তা হলো কাজল। যুগে যুগে কাজলের রেখা পাল্টে যায়। তবে পুরু টানা কাজল যেন সেই পুরোনো দিনগুলোর কথাই মনে করিয়ে দেয়, যেখানে জিজ্ঞাসু হয়েছিল লাবণ্য, অভিমানে ছলছল হয়েছিল কেটি মিত্র আর পুলকিত হয়েছিল চারুলতার চোখ। তাঁর সৃষ্টিতে সাজের অনুষঙ্গে জড়িয়ে ছিল তাজা ফুল ও ফুলের মালা।