ঘুম থেকে জেগেছি সূর্য ওঠার আগেই। কিন্তু চোখে নিদ্রাদেবী এখনো ভর করে আছেন। অনেক কষ্টে জেগে থাকার চেষ্টা করছি। কারণ, আজ সকাল সকাল বের হতে হবে নতুন গন্তব্যের দিকে। আমি ছাড়া অন্য সবাই ঘুমে। চোখ থেকে ঘুম তাড়াতে কী করা যায়, ভাবতে ভাবতে শেষ পর্যন্ত আবারও ঘুমিয়ে গেলাম। সকাল ৭টার দিকে মায়ের ডাকাডাকির পর ঘুম থেকে উঠে দেখি, আমি ছাড়া সবাই তৈরি হয়েছে বেরিয়ে পড়ার জন্য!
আজ আমরা যাচ্ছি সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে; হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রঘুনন্দন পাহাড়ে, ঢাকা সিলেট মহাসড়কের পাশে। আমাদের বহনকারী গাড়ি ছুটে চলছে গন্তব্যের দিকে—বালাগঞ্জ, শেরপুর পেরিয়ে। গাড়িতে সবাই আরেকটু ঘুমানোর চেষ্টা করছে। জাতীয় উদ্যানটি কয়েকটি চা-বাগান, গ্রাম, শহর এবং চাষের জমি দিয়ে ঘেরা। সাতছড়ি উদ্যানের কাছাকাছি ৯টি চা-বাগান আছে। উদ্যানের পশ্চিম দিকে সাতছড়ি আর পূর্ব দিকে চাকলাপুঞ্জি চা-বাগান। টিপরাপাড়া নামে একটি গ্রাম রয়েছে উদ্যানটির ভেতরে। সেখানে ২৪টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবার বসবাস করে। আশপাশের ১৪টি গ্রামের মানুষ, বিশেষ করে চা-বাগানের শ্রমিক এবং বনে বসবাসকারী মানুষ বিভিন্নভাবে বনজসম্পদের ওপর নির্ভরশীল।
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে আছে ১৪৫ প্রজাতির গাছপালা এবং ১৯৭ প্রজাতির জীব। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৪৯ প্রজাতির পাখি, ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৬ প্রজাতির উভচর প্রাণী। এই উদ্যানের উল্লুকগুলোর এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফালাফি এবং পোকামাকড়ের বিচিত্র শব্দ পর্যটকদের দারুণ আনন্দ দেয়। এই বনে ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে উল্লুক, মেছোবাঘ, শূকর, সাপ, মুখপোড়া হনুমান, চশমা হনুমান, লজ্জাবতী বানর প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ১৪৯ প্রজাতির পাখির মধ্যে ধনেশ, লাল মাথা ট্রগন এবং বিরল উদ্ভিদের মধ্যে বিষলতা, পিতরাজ, কানাইডিঙ্গা, আগর ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তবে এখানকার ২০ প্রজাতির বন্য প্রাণী বিলুপ্ত হতে চলছে। বিলুপ্তপ্রায় এসব প্রজাতির মধ্যে রয়েছে চিতা বাঘ, মেছোবাঘ, লজ্জাবতী বানর, মায়া হরিণ, উল্লুক, ময়না পাখি, ঘুঘু পাখি, টিয়া পাখি, ইগল পাখিসহ উল্লেখযোগ্য।
ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে এলাম সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের দরজায়। কাউন্টার থেকে টিকিট কাটার পর হেঁটে এগিয়ে গেলাম। টিকিট কাউন্টারের উল্টো পাশে দেখা পেলাম রোমাঞ্চকর
ট্রি অ্যাকটিভিটির। সহযাত্রীরা সবাই বললেন, আগে বনের ভেতরে ঘুরে আসি। পরে ট্রি অ্যাকটিভিটি। আমরা বনের দিকে এগিয়ে গেলাম।
পথেই পড়বে ওয়াচ টাওয়ার। তাতে উঠে পড়লাম আমরা। উঁচু এই টাওয়ার থেকে নিচে তাকালে মনে হবে, চারদিকে সবুজের গালিচা পেতে রাখা! এ দৃশ্য যে কাউকে মোহিত করবে। ওয়াচ টাওয়ার থেকে নেমে আমরা আরও সামনের দিকে গেলাম। এই বন আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টা ও তিন ঘণ্টার তিনটি ট্রেইল ধরে ঘুরে দেখা যায়। আমরা এক ঘণ্টার ট্রেইল বেছে নিই। প্রথমে ভেবেছিলাম, একজন গাইড নেব পথের দিশা পেতে। কিন্তু আমাদের সঙ্গে বনে প্রবেশ করা একটি গ্রুপের সদস্য ছিলেন একজন স্থানীয়। তাঁকেসহ তাঁর দলটিকে অনুসরণ করে আমরা হাঁটতে থাকলাম জঙ্গলের ভেতর।
অসাধারণ পরিবেশ। যেদিকে তাকাই সবুজ আর সবুজ। হঠাৎ দেখা পেলাম একদল বানর এক গাছ থেকে অন্য গাছে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আমাদের সামনে আরেকটি দল চলছে। পথ খুব একটা কঠিন নয়। তবে একটি ব্যাপার মনে রাখতে হবে। ডানে বা বাঁয়ে না যাওয়াই ভালো। আমরা হাঁটতে হাঁটতে এক ঘণ্টার ট্রেইলের শেষ পর্যন্ত চলে আসি। ট্রেইল শেষ করেও ২০ মিনিটের মতো হাঁটলাম। ইচ্ছা হচ্ছিল না ফিরে আসতে। ভাবছিলাম, আরও গভীরে যাই।
একটি কথা বলে রাখি। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ভেতরে যেতে পর্যাপ্ত পানি এবং কিছু শুকনো খাবার সঙ্গে রাখা খুব জরুরি। আরেকটি কথা, এই এলাকায় মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক থাকবে না। সে কারণে পরিবারের লোকজনকে আগে থেকে বলে রাখতে হবে, যাতে কেউ অযথা দুশ্চিন্তা না করে। আর দলের সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হবে। দলছুট হয়ে গেলে জঙ্গলে কাউকে খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। আমরা প্রায় দুই ঘণ্টা জঙ্গলের ট্রেইলে ঘুরে ফিরে আসি। ফেরার সময় ক্লান্ত হয়েও জনপ্রতি ১০০ টাকার বিনিময়ে টিকিট কেটে ফেললাম। গাছের ওপর মই দিয়ে উঠে কয়েক ধাপে এক গাছ থেকে আরেক গাছে যাওয়াটা বেশ রোমাঞ্চকর।
■ কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে যাওয়ার সহজ পথ হলো, প্রথমে সিলেটগামী যেকোনো বাসে মাধবপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে নামতে হবে। সেখান থেকে বাস কিংবা ম্যাক্সিতে করে সাতছড়ি যাওয়া যায়। এ ছাড়া ঢাকা থেকে রেল ও সড়কপথে হবিগঞ্জ গিয়ে, সেখান থেকেও সাতছড়ি যাওয়া যায়। আবার দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে হবিগঞ্জ শহরে গিয়ে, সেখান থেকে সাতছড়ি উদ্যানে যাওয়া যাবে।
■ গাইড নিতে হবে
সাতছড়ি উদ্যানের তথ্যকেন্দ্রে গাইড পাওয়া যায়। সেখান থেকে গাইড নিতে হবে। ট্রেইল অনুযায়ী গাইডের ফি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা।