বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের ধারাবাহিকতা বুঝতে প্রত্নস্থল ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। বিসিএস, ব্যাংক জবসহ সব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এসব স্থান থেকে নিয়মিত প্রশ্ন আসে। কোন স্থাপনাটি কোথায় অবস্থিত, কোন যুগে নির্মিত এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী—এসব তথ্য পরীক্ষার্থীদের নখদর্পণে থাকা জরুরি। চলুন, দেশের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রত্নস্থল ও ঐতিহাসিক স্থাপনার আদ্যোপান্ত সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
মহাস্থানগড়
বাংলাদেশের প্রাচীনতম নগর সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে মহাস্থানগড় ঐতিহাসিকভাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এটি বগুড়া জেলা শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। প্রাচীন ‘পুণ্ড্রবর্ধন’ বা ‘পুণ্ড্রনগর’-এর ধ্বংসাবশেষ এখানে আবিষ্কৃত হয়েছে। এই নগরীটি মৌর্য যুগে (খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক) সমৃদ্ধির শিখরে ছিল। ১৯৩১ সালে এখানে প্রাপ্ত একটি শিলালিপি (ব্রাহ্মীলিপি) থেকে প্রমাণিত হয়, এটিই বাংলার প্রাচীনতম নগরী।
সোমপুর মহাবিহার (পাহাড়পুর)
নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুরে অবস্থিত সোমপুর মহাবিহার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধবিহার। পাল বংশের দ্বিতীয় রাজা শ্রী ধর্মপাল অষ্টম শতকের শেষ দিকে এটি নির্মাণ করেন। এর বিশালতা ও স্থাপত্যশৈলীর কারণে ১৯৮৫ সালে ইউনেসকো একে ‘বিশ্বঐতিহ্যবাহী স্থান’ হিসেবে ঘোষণা করে। উত্তরবঙ্গের সমতলভূমিতে অবস্থিত এই বিশাল বৌদ্ধবিহারটি ছিল তৎকালীন বৌদ্ধ শিক্ষার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র, যেখানে তিব্বত ও চীন থেকেও শিক্ষার্থীরা জ্ঞানার্জনে আসত।
ময়নামতি
কুমিল্লা জেলা শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে ময়নামতি ও লালমাই পাহাড়জুড়ে বিস্তৃত এ প্রত্নস্থল প্রাচীন ‘সমতট’ জনপদের অন্তর্গত ছিল। এখানে অষ্টম শতাব্দীর ‘শালবন বিহার’সহ আনন্দ বিহার, কোটিলা মুড়া ও ইটাখোলা মুড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই অঞ্চল বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র ছিল। খননকাজে প্রাপ্ত অসংখ্য স্বর্ণমুদ্রা ও পোড়ামাটির ফলক সে সময়ের উন্নত অর্থনীতির সাক্ষ্য দেয়।
ষাটগম্বুজ মসজিদ
বাগেরহাটে অবস্থিত এ মসজিদ মধ্যযুগীয় মুসলিম স্থাপত্যের এক অনন্য কীর্তি। পঞ্চদশ শতকে (১৪৫৯ সালে) উলুগ খানজাহান আলী এটি নির্মাণ করেন। মসজিদের নামকরণে ‘ষাট’গম্বুজ বলা হলেও এর গম্বুজ সংখ্যা নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তি হয়। বাস্তবে এই মসজিদে মোট ৮১টি গম্বুজ রয়েছে (ছাদের ওপর ৭৭টি এবং চার কোণে ৪টি মিনার আকৃতির গম্বুজ)। তুর্কি স্থাপত্যের প্রভাবে নির্মিত এই বিশাল ইমারতটি ইউনেসকো বিশ্বঐতিহ্যবাহী স্থানের অন্তর্ভুক্ত।
লালবাগ কেল্লা
পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত লালবাগ কেল্লা মোগল স্থাপত্যের এক অপূর্ণাঙ্গ অথচ শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। ১৬৭৮ সালে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র যুবরাজ মুহাম্মদ আজম শাহ এর নির্মাণকাজ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে নবাব শায়েস্তা খান এর কাজ চালিয়ে যান। কিন্তু তাঁর প্রিয় কন্যা পরীবিবির অকালমৃত্যুতে তিনি একে ‘অপয়া’ মনে করে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন। দুর্গের ভেতরে পরীবিবির মাজার, হাম্মামখানা (দরবার হল) ও একটি তিনগম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ রয়েছে।
আহসান মঞ্জিল
বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে কুমারটুলী এলাকায় অবস্থিত আহসান মঞ্জিল ছিল ঢাকার নবাবদের আবাসিক প্রাসাদ ও প্রশাসনিক সদর দপ্তর। ১৮৫৯ সালে নবাব আবদুল গনি এর নির্মাণকাজ শুরু করেন এবং ছেলের নামানুসারে এর নাম রাখেন ‘আহসান মঞ্জিল’। ১৮৮৮ সালের প্রবল ভূমিকম্পে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে আবার সংস্কার করা হয়। বর্তমানে এটি একটি জাতীয় জাদুঘর। এই প্রাসাদ ঢাকার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের বহু ঘটনার সাক্ষী, বিশেষ করে মুসলিম লীগের জন্ম প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।