চাকরির ভাইভার পারফরম্যান্সে সদ্য স্নাতক ও অভিজ্ঞ প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, অনেক শিক্ষার্থী এমন কিছু ভুল করেন, যেগুলো অল্প সচেতন হলেই এড়ানো সম্ভব। অথচ এসব ভুলের কারণেই বহু সম্ভাবনাময় প্রার্থী চাকরির সুযোগ হারান।
বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, নিয়োগকর্তারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন পেশাদার আচরণ, যোগাযোগ দক্ষতা এবং ক্যারিয়ার-সম্পর্কিত সচেতনতার ওপর।
বাস্তবে দেখা যায়, জীবনবৃত্তান্তে শিক্ষার্থীরা যেসব দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার দাবি করেন, ভাইভায় তা ঠিকভাবে তুলে ধরতে পারেন না।
বিভিন্ন নিয়োগকর্তা ও এইচআর ম্যানেজারের ওপর করা ক্যারিয়ার বিল্ডারের এক জরিপে বলা হয়েছে, একাডেমিক ফলের চেয়ে আচরণগত দুর্বলতা, অস্পষ্ট উত্তর এবং প্রস্তুতির অভাবই বেশি ক্ষেত্রে প্রার্থীদের বাদ পড়ার কারণ। এই গবেষণাগুলো মিলিয়ে চাকরির ইন্টারভিউতে শিক্ষার্থীদের পাঁচটি সাধারণ ভুল চিহ্নিত করা হয়েছে—
১. প্রতিষ্ঠান বা দায়িত্বের বিষয়ে খোঁজ না নেওয়া
ইন্টারভিউয়ের সবচেয়ে বড় ও সাধারণ ভুল হলো, কোম্পানি সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকা। ২০২৩ সালে প্রকাশিত এইচআর গ্যাজেটের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি প্রার্থীর আগ্রহ ও উদ্যমের অভাব প্রকাশ করে।
এ ছাড়া এনএসিই জব আউটলুক ২০২৫ অনুযায়ী, নিয়োগকর্তারা চান প্রার্থীরা নিজেদের দক্ষতাকে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করুক।
যেভাবে সমাধান করবেন: প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট, এবং চাকরির বিবরণ ভালোভাবে পড়ুন। আপনার অভিজ্ঞতা কীভাবে টিম বা প্রতিষ্ঠানের কাজে লাগবে, তা দুই-তিন লাইনে প্রস্তুত রাখুন।
২. দুর্বল, অস্পষ্ট উত্তর এবং দুর্বল যোগাযোগ দক্ষতা
নিয়োগকর্তারা সাধারণত শিক্ষার্থীদের দক্ষতার অভাবের কারণে নয়, বরং সেই দক্ষতা ব্যাখ্যা করতে না পারার কারণে প্রত্যাখ্যান করেন। লন্ডনের গালওয়ের মাইকেল ফ্র্যাঙ্ক একজন জনপ্রিয় নিয়োগকর্তা। তাঁর লেখায় তিনি বলেছেন, ভাসা ভাসা উত্তর এবং সমস্যা সমাধানের উদাহরণ না দিতে পারা সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। এনএসিই জরিপেও যোগাযোগ ও সমালোচনামূলক চিন্তায় শিক্ষার্থীদের ঘাটতির কথা উঠে এসেছে।
যেভাবে সমাধান করবেন: উত্তর দেওয়ার সময় ‘STAR’ পদ্ধতি অনুসরণ করুন—Situation, Task, Action, Result. সংক্ষিপ্ত কিন্তু বাস্তব উদাহরণ দিন।
৩. পেশাদার আচরণ ও দেহভঙ্গির অভাব
ইন্টারভিউতে প্রথম ছাপ তৈরিতে আচরণ ও দেহভঙ্গির গুরুত্ব অনেক বেশি। ক্যারিয়ার বিল্ডারের জরিপে দেখা গেছে, ৬৭ শতাংশ নিয়োগকর্তা চোখে চোখ না রেখে কথা বলাকে নেতিবাচক হিসেবে দেখেন, ৩২ শতাংশ অতিরিক্ত নড়াচড়া বা হাত গুটিয়ে বসাকে অপছন্দ করেন। এ ছাড়া অনুপযুক্ত পোশাক ও অহংকারী আচরণও বড় ভুল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
যেভাবে সমাধান করবেন: চোখে চোখ রেখে কথা বলুন, স্বাভাবিক হাসি বজায় রাখুন, সোজা হয়ে বসুন। মোবাইল বন্ধ রাখুন, সময়মতো পৌঁছান এবং পোশাকে পেশাদার থাকুন; এই ছোট বিষয়গুলোই বড় প্রভাব ফেলে।
৪. কোনো প্রশ্ন না করা বা আগ্রহ না দেখানো
ভাইভা শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার নয়; আপনার আগ্রহ ও মনোভাব প্রকাশের সুযোগও। তাই ভাইভা শেষে কোনো প্রশ্ন না করা মানে অনেক সময় অনাগ্রহ প্রকাশ করা।
যেভাবে সমাধান করবেন: প্রথম কয়েক মাসের কাজের অগ্রাধিকার, সাফল্যের মাপকাঠি বা টিমের কাজের ধরন সম্পর্কে প্রশ্ন করুন। এতে আপনার প্রস্তুতি ও দীর্ঘমেয়াদি আগ্রহ ফুটে উঠবে।
৫. মিথ্যা বলা, দক্ষতা বাড়িয়ে বলা ও ফোন ব্যবহার
ভাইভায় ব্যর্থ হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো অসততা। ক্যারিয়ার বিল্ডার জরিপ অনুযায়ী, ৬৬ শতাংশ নিয়োগকর্তা মিথ্যা ধরা পড়াকে মারাত্মক ভুল মনে করেন, আর ৬৪ শতাংশ ইন্টারভিউ চলাকালে ফোন ব্যবহার নেতিবাচকভাবে দেখেন।
যেভাবে সমাধান করবেন: নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে সৎ থাকুন এবং উদাহরণ দিয়ে কথা বলুন। ভাইভা চলাকালে ফোন ধরবেন না বা খুদে বার্তা পড়বেন না। এতে নিয়োগকর্তার আস্থা নষ্ট হয়।
গবেষণাগুলো স্পষ্টভাবে বলছে, চাকরির ভাইভায় ভালো ফল করার জন্য শুধু ভালো রেজাল্টই যথেষ্ট নয়। প্রস্তুতি, স্পষ্টভাবে কথা বলা, পেশাদার আচরণ ও সততাই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। যেসব শিক্ষার্থী আগে থেকে প্রস্তুতি নেন, বাস্তব উদাহরণ অনুশীলন করেন, দেহভঙ্গির দিকে নজর দেন, ভালো প্রশ্ন করেন এবং সৎ থাকেন; তাঁদের চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে